সত্তরের নির্বাচনে ফজলুল কাদের চৌধুরীর পরাজয় এখন ইতিহাস। কিন্তু এই ইতিহাসের পেছনে আরো একটি ইতিহাস রয়েছে। তবে কোন ইতিহাসে সেটা লেখা নেই। ৭০-এর নির্বাচনের রায়ে স্বীকৃতি দিতে পাকিস্তানি শাসকদের অনীহা মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে । বাংলাদেশ-এর পরিস্থিতি আলোচনার জন্য পাকিস্তানি জেনারেলরা হাঁস শিকারের নামে লারকানায় ভুট্টোর খামারে যান। তারা সেখানে যা বলেছিলো তা ছিলো বাঙালির বিরুদ্ধে চরম বিষোদগার। তারা বললো বাঙালির বড় বাড় বেড়ে গেছে। তাদের আচ্ছা করে শায়েস্তা করতে হবে। অতঃপর তারা গণহত্যার মাধ্যমে এথনিক ক্লিনসিং-এর সিদ্ধান্ত নেন। ২৫ মার্চ বুলডোজার দিয়ে বাঙালির বুকের পাঁজর গুঁড়িয়ে দিতে দিতে বর্বর খান সেনাদের সে কী পৈশাবিক উল্লাস ! বাঙালি যুদ্ধে তাদেরকে পরাজিত করে যোগ্য জবাব দিয়েছে। ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো; এরপর অর্ধশতাধি বছর কেটে গেছে। ইতিমধ্যে আমাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে ৭১-এ রাউজানের নির্বাচনের লুকায়িত ইতিহাস। আমরা জানতে পারলাম ৭ ডিসেম্বর ৭১-এর নির্বাচনের পরপরই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এমন কথা চাউর হয়ে গিয়েছিলো রাউজানে যে, ফ কা চৌধুরী ওপরে পরাজিত হয়েছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের কাছে কিন্তু ভিতরে তিনি পরাজিত হন গুজরার ‘বড় হুজুর’ ওসমান আলী মাস্টারের পুত্র ফজলুল হকের কাছে। শুধু আমার মুখের কথা নয়, নির্বাচনকালীন একটি ঘটনা থেকেই তার সত্যতা প্রমাণিত হয়। সেটি হলো জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের সর্বশেষ নির্বাচনী মিছিল ফ কা চৌধুরীর লাঠিয়ালদের হাতে আক্রান্ত হয়েছিলো এবং ফজলুল হকের বীরত্বে সেই হামলা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
আরো ঘটনা আছে, ৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু রাউজানে জাতীয় পরিষদে ফজলুল হককে নমিনেশন দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফজলুল হক তো কোন পদ চান না, ক্ষমতার মোহ ছিলো না তাঁর। অতএব তিনি সবিনয়ে রিফিউজ করে অধ্যাপক খালেদকে নমিশনেশন নেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন। ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমদই রাউজানে এম এন প্রার্থী হিসেবে ফজলুল হকের প্রস্তাব করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। অবশ্য চট্টগ্রাম থেকে পালামেন্টারি বোর্ডের একমাত্র সদস্য এম এ আজিজও অধ্যাপক খালেদের নাম প্রস্তাব করেছিলেন।
নির্বাচনের পূর্বে খালেদ সাহেবের সমর্থনে জলিলনগর বাস স্ট্যান্ড থেকে একটি বিশাল গণমিছিল বের করা হয়েছিলো, সেটি রাউজানের বিভিন্ন স্থান ঘুরে মগদাই খালের ব্রিজের ওপর পৌঁছলে ফকা চৌধুরীর উচ্ছৃঙ্খল সমর্থকরা হামলা করে এবং মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এমন সময় এ কে ফজলুল হক অসীম সাহসে হামলাকারিদের মোকাবেলায় এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে দেখে মুসলিম লীগের গুণ্ডাবাহিনী ভয়ে পালিয়ে যায়। কারণ ফজলুল হক সাহেব ৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধের পর থেকে ‘কমান্ডার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি মিছিলের পেছনে ছিলেন, কিন্তু মিছিলের সম্মুখভাগে আক্রমণ হয়েছে শুনে তিনি হুংকার দিয়ে বীর বিক্রমে সম্মুখে এগিয়ে যান। এই ঘটনা রাউজানে নির্বাচনী পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়, খালেদ সাহেবের পক্ষে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের পর বলাবলি হতে থাকে যে, ফজলুল হক সাহেবের কাছেই ফজলুল কাদের চৌধুরী পরাজিত হয়েছেন। পাক-ভারত যুদ্ধের পর তিনি রাউজানে যুবকদের নিয়ে লেফ্ট রাইট লেফ্ট রাইট ট্রেনিং দিয়েছিলেন। সেই থেকে তাঁর নামের সঙ্গে কমান্ডার শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়।
রাউজানে ৭০-এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন সূচিত হয়, তাতে মুসলিম লীগ পেছনে হটে যায়, আওয়ামী লীগ সামনে চলে আসে। পাকিস্তান আমলে রাউজান ছিলো মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর প্রভাবাধীন একটি এলাকা এবং সেখানে বারবার মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী নির্বাচিত হতেন। এমনকি যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, যে নির্বাচনে মুসলিম লীগের নাম নিশানা মুছে গিয়েছিলো পূর্ববঙ্গের মাটি থেকে, সে নির্বাচনেও মুসলিম লীগ প্রার্থী ফজলুল কাদের চৌধুরী জয় লাভ করেছিলেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন একজন জাঁদরেল নেতা, যিনি পরে পাকিস্তানের চারটি দপ্তরের মন্ত্রী, স্পিকার এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত হয়েছিলেন। সুতরাং ৭০-এর নির্বাচনে যখন আবার ফজলুল কাদের চৌধুরী জাতীয় পরিষদের প্রার্থী হলেন এবং তাঁর সামনেই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থিত হলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক ও দৈনিক আজাদীর অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, তখন এ মোকাবেলাটা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে রাজউানে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছিলো। যেহেতু ইতিহাস ফজলুল কাদের চৌধুরীর পক্ষে, তাই আওয়ামী লীগ প্রার্থী তাঁর মোকাবেলায় কতটুকু এঁটে উঠতে পারবেন, তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় ছিলো। আবার কিছু কিছু লোক পূর্বের ইতিহাস স্মরণ করে বলছিলেন, ফজলুল কাদের চৌধুরী আবার জিতবেন।
কিন্তু খালেদ সাহেবের সৌভাগ্য এবং ফজলুল কাদের চৌধুরী দুর্ভাগ্য হলো সেবার আওয়ামী লীগ ও নৌকার পক্ষে জনজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিলো। রাউজানে খালেদ সাহেব ও নৌকার পক্ষে জনজোয়ার সৃষ্টিতে যাঁরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ডা. শামসুল আলম চৌধুরী, প্রাদেশিক পরিষদ প্রার্থী আবদুল্লাহ আল হারুন, নুরু মিয়া মাস্টার, সাধন কুমার ধর, প্রফুল্ল রঞ্জন সিনহা, ডা. এ কে এম আবু জাফর, ডা. জাকেরিয়া চৌধুরী, অধ্যাপক আবু তাহের রিজভী, মুছা মিয়া মাস্টার ও মোফাছেল আহমদ চৌধুরী প্রমুখ। তাদের সঙ্গেই আরো একটি নাম যোগ করতে হবে তিনি হচ্ছেন এ কে ফজলুল হক। তিনি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত অনুচর এবং ‘গুপ্তচর’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করেন এবং স্বাধীনতার পর বিনাজুরী ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এ কে এম ফজলুল হক একাধারে রাজনীতিবিদ, ভাষা সৈনিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাব্রতী ও সমাজসংস্কারক ছিলেন। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে রাউজান থানার গুজরা গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা ‘বড় মাস্টার’—খ্যাত শিক্ষাবিদ, আধ্যত্মিক সাধক ওছমান আলী। বিপ্লবী চট্টলা এবং ৪৭-এর দেশভাগ-উত্তর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকা- বর্তমানে মেগাসিটিতে রূপান্তরিত উক্ত দুই সিটিতে ঘুরে ঘুরে তিনি একটি নতুন রাজনীতির বার্তা মানুষের কানে কানে পৌঁছে দিয়েছিলেন। নতুন দেশ পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত পূর্ববঙ্গের ভুগোলকে আশ্রয় করে এই রাজনীতির উদ্ভাবন করেন শেখ মুজিবুর রহমান (পরবর্তীকালে ‘বঙ্গবন্ধু’)। এই নতুন রাজনীতি হলো স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় কলকাতায়, বিভাগ-পূর্বকালে। স্ব-থানার সুলতানপুর গ্রামের অধিবাসী মোহাম্মদ খালেদ (পরবর্তীকালে অধ্যাপক, দৈনিক আজাদীর সম্পাদক ও সংসদ সদস্য) কলকাতায় অধ্যয়ন করতেন ইসলামিয়া কলেজে। সেই সূত্রেই ফজলুল হকের কলকাতা গমন; শেখ মুজিবুর রহমানও তখন ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন, থাকতেন বেকার হোস্টেলে। একদিন শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হলে খালেদ সাহেব ফজলুল হকের সাথে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেন।
পরে ফজলুল হক যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান, তখন শেখ মুজিবুর রহমানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। শেখ মুজিব তখন ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। ৪৮-এ তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করে সেটাকে একটি মেয়াদী বোমা হিসেবে পুঁতেছিলেন। এই মেয়াদী বোমায় ৭১-এর বিস্ফোরিত হয়ে পাকিস্তান ধ্বংস করেছিলো। ৪৯-এ তিনি আরেকটি বোমা তৈরি করেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও শামসুল হকের সহযোগে। সেই বোমার নাম আওয়ামী লীগ। এই বোমাটি ছিলো একটি পারমানবিক বোমা ।
শেখ মুজিব যখন পাকিস্তান বধের জন্য এসব কাজের পেছনে ছুটোছুটি করছিলেন, তখনই চট্টগ্রামের নবীন যুবক, তাঁকে স্বাধীনতা-বিপ্লবের মন্ত্রগুপ্তি দেন শেখ মুজিব। শেখ মুজিবকে গুরু হিসেবে বরণ করে নেন ফজলুল হক এবং গুরুর মন্ত্রগুপ্তি নিয়েই ফজলুল হক সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। ৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি যখন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার জন্য ছাত্ররা ৫জন করে বের হচ্ছিলেন, ফজলুল হকও সেখানে ছিলেন। তাঁর সামনেই গুলি খেয়ে পড়ে যান, রফিক, জব্বার, বরকত, সালামসহ অনেক ছাত্র। তাঁর কানের পাশ দিয়েই একটি গুলি চলে যায়। তিনি আহত ছাত্রদের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কিংবদন্তী শিক্ষক, ভাষাতাত্ত্বিক, মনীষী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র শিল্পী মুর্তজা বশীর তাঁর বন্ধু। ফজলুল হকের পিতা ওছমান আলী মাস্টার ছিলেন ড. শহীদুল্লাহর বন্ধু। সেই সুবাদে মুর্তজা বশীরের সঙ্গে ফজলুল হকের দোস্তি। মাস্টার সাহেব শিক্ষকতাকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়তে গিয়েছিলেন। তখনই সম্ভবত সতীর্থ ছিলেন ড. শহীদুল্লাহ। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে গ্রেফতারও হয়েছিলেন ফজলুল হক। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে শিল্পী মুর্তজা বশীর লিখেছেন-“১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে আমি তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। ফজলু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। একসাথে থাকি-খাই-আড্ডায় সময় কাটে। সে সময় হাজং বিদ্রোহ চলাকালে আমারই আঁকা পোস্টার ছিঁড়ে যাওয়ায় জোড়া লাগাতে গিয়ে পুলিশের কাছে গ্রেফতার হলাম। চরম নির্যাতন ভোগ করি। আমার বন্ধুও গ্রেফতার। বিনাদোষে সে কারাভোগ করলো আমার সাথে। এটি এখনো আমাকে কষ্ট দেয়। দু’বন্ধু ভাষা আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হই। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবিদ্ধ বরকতসহ অন্য সহযোদ্ধাদের সাথে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের অনেক বন্ধুর মধ্যে ফজলুল হক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।” ফজলুল হক সাহেবই বোধ হয়, চট্টগ্রামের একমাত্র ব্যক্তি যিনি ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারি গোলাগুলির সময় সেখানে ছিলেন।
ফজলুল হক সাহেবের সাথে শিল্পী মুর্তজা বশীরের সম্পর্ক অটুট ছিলো আজীবন। সে কথা স্মরণ করে তিনি লিখেছেন-“১৯৭১ সালের ৪ নভেম্বর আমি সপরিবারে ফ্রান্সে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ফজলুর সাথে নিবিড় যোগাযোগ ছিলো। মাঝখানে বন্ধ। সে তখন প্রচন্ড ব্যস্ত সময় অতিক্রম করছে।
১৯৭৩ সালের জুনে দেশে ফিরি এবং আগস্টের ১ তারিখে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগে যোগ দিই। তারপর আবার বন্ধুতায় ভাসি আমরা।….ঢাকায় আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আনিসুজ্জামান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, রশিদ চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাকসহ বেশ ক’জন পরবর্তীতে বিদগ্ধ ব্যক্তি ও গুণী শিল্পীতে পরিণত হন। এ.কে ফজলুল হক শেরে বাংলার মতো সমাজসেবা এবং রাজনীতিতেই আমৃত্যু সুনাম রেখে যেতে পেরেছে।
আমার তুই-তোকারী বন্ধু ফজলুল হক গুছিয়ে কথা বলতো। সভা সমিতিতে গেলেও ফিতা কাটতে পছন্দ করতো না, বক্তৃতায় অনীহা ছিলো কিন্তু সে অনলবর্ষী বক্তা ছিলো। তার চমৎকার ভাষাশৈলী ও অসাধারণ উপস্থাপনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো শ্রোতারা। সে ছিলো অনন্য ব্যক্তিত্বের আধার।”
সেই যে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের পাঠ নিলেন ফজলুল হক সাহেব, আর কখনো ভিন্ন পথে হাঁটেননি। কখনো ক্ষমতার জন্য লালায়িত হননি, বিত্তবাসনা জাগেনি অন্তরে; জেল-জুলুম সয়ে আন্দোলন-সংগ্রামের মিছিলে হেঁটে হেঁটে কাটিয়ে দিয়ে গেছেন ক্লান্তিহীন জীবন গণমানুষেরই চারণ এ কে ফজলুল হক।
১৯৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের জন্ম ও ১৯৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগের জন্ম খুব কাছে থেকেই দেখেছেন সে সময় ঢাকাবাসী ফজলুল হক। তাঁর জন্মসন ১৭ জুলাই ১৯৩২; বাংলার ইতিহাসে এই সময়টা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভয়ংকর। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে আরম্ভ হয়েছিলো স্বদেশী আন্দামান, ১৯৩৯-এ আন্দোলন থেকে বিপ্লবীরা একে একে বেরিয়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত এই সময়টা অগ্নিযুগ নামে পরিচিত। তখন মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত তরুণ অরুণ যে আস্তাচলে গিয়েছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। ১৯৩০, ১৯৩১, ১৯৩২— অগ্নিযুগে সর্বাধিক অগ্নি উদগীরণের ঘটনা ঘটেছিল। এই সময় বিপ্লবীরা যেন আগুনের ওপর নৃত্য আরম্ভ করেছিলেন; ১৯৩০-এ মহাবিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ ও জালালাবাদ যুদ্ধ; ১৯৩১-এ নেজামত পল্টনে (পলোগ্রাউন্ড) খেলা দেখার সময় অত্যাচারী দারোগা আহছান উল্লাহকে হত্যা; ১৯৩২-এ উপমহাদেশের প্রথম শহীদ নারী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান রেলওয়ে ক্লাব আক্রমণ করে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন বিপ্লবীরা।
আর এই বত্রিশেই চট্টগ্রামের রাউজান থানার গুজরা গ্রামে বড় মাস্টারের ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিলো যে শিশুটি, তিনিই ফজলুল হক। তখন বত্রিশে জন্মগ্রহণকারী হক সাহেব একাত্তরে বিপ্লবী মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যান। বিপ্লবের আবহে যাঁর জন্ম, বড় হয়ে তাঁর বিপ্লবে দীক্ষা নেওয়াটাই ছিলো স্বাভাবিক ঘটনা; মাস্টারদার উত্তরসূরী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ৭১-এ ‘বাংলাদেশ বিপ্লব’ ঘটিয়ে মাস্টারদার স্বপ্নকেই যেন সার্থক করে তুলেছিলেন।
১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ২৩ জুন ঢাকায় আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর সেবছরই চট্টগ্রামের দলটির শাখা গঠনের জন্য তোরজোড় শুরু করেন মওলানা আবদুর রহমান চৌধুরী, মওলানা এ কে এম আবু তাহের, এম এ আজিজ, জহুর আহমদ ও সালারে জিলা শহীদ শেখ মোজাফফর আহমদ। এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, সালারে জিলা শেখ মোজাফফর আহমদ, মওলানা এ আর চৌধুরী, মওলানা আবু তাহের, মওলানা ছালে জহুর, ডা. শামসুল আলম চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ গঠন এবং রাউজানে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, ডা. জাকেরিয়া চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ গঠনের অসম্ভব কাজ সম্ভব করে আবার ঢাকার বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান ফজলুল হক।
ফজলুল হক যে জাতীয় রাজনীতিতেও অবদান রেখেছিলেন, সেটা এযাবৎ অজ্ঞাতই থেকে গেছে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধে মুজিববাহিনীর চার প্রধানের অন্যতম, সাবেক মন্ত্রী ও এমপি তোফায়েল আহমদের একটি অসমাপ্ত এবং অপ্রকাশিত লেখা পড়ে, হক সাহেব বিভিন্ন সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন সে সম্পর্কে জানতে পারলাম। হক সাহেবের সুযোগ্য পুত্র, লেখক ও কলামিস্ট শওকত বাঙালির কাছ থেকে তোফায়েল আহমদের লেখাটি পাই। তোফায়েল আহমদ নিজেকে হক সাহেবের একজন শিষ্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে লিখেছেন—“তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা। এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৪৮ সালে যখন ভাষা আন্দোলন শুরু হয় তখন তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন অগ্রসেনানী। ১৯৫৪ সালে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন ভাষা আন্দোলনে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অন্যতম অকুতোভয় সৈনিক তিনি। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর তিনি আত্মগোপনে যান এবং অনেকদিন সে অবস্থায় জীবনযাপন করেন। ১৯৬২ সালে আইয়ুবের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে তিনি বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ছিলেন একজন সহজ সরল মানুষ। মূলত: ছাত্রনেতারাই ছিলেন তাঁর টার্গেট। তাঁর রাজনৈতিক বোঝাপড়া এবং ছাত্রনেতাদের সাথে একাত্মতা তাঁকে রাজনৈতিক মহলে জনপ্রিয় নেতায় পরিণত করেছিলো।
আমার সাথে পরিচয়ের সুবাদে তাঁর অসাধারণ পান্ডিত্য এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি তাঁর দ্বিধাহীন আনুগত্য আমাকে মুগ্ধ করে, প্রেরণা যোগায়। তাঁর সাথে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। আমি তাঁর গুণমুগ্ধ অনুসারীতে পরিণত হই।
আমাদের সময়ে সংগঠনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দিলে আমি যখন হতাশাগ্রস্ত হতাম তখন মরিয়া হয়ে তাঁকে খুঁজে ফিরতাম। তিনি আমার হতাশা কাটিয়ে উঠে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার তাগিদ দিতেন।
যখনই তাঁর সাথে দেখা হয়েছে তখনই এদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং আওয়ামী রাজনীতিকে তৃণমূলে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় সে বিষয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করতেন।
বস্তুত আমার রাজনৈতিক জীবনে তাঁর মতো সহজ-সরল হৃদয়বান এবং খাঁটি দেশপ্রেমিক এই পরশ পাথরের সংস্পর্শ না পেলে আমি তোফায়েল হয়ে উঠতাম না।”






