বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩০ পৌষ, ১৪৩২, ২৪ রজব, ১৪৪৭

আলমাস শিমুলের সহমত পোষণ করে বলতে চাই চট্টগ্রাম উন্নয়ন মন্ত্রণালয় হোক

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য আলাদা একটি মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পপতি, জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব আলমাস শিমুল। এই মন্ত্রণালয়ের কাজ হবে বাণিজ্যিক রাজধানীর সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যদি আলাদা মন্ত্রণালয় থাকতে পারে, তাহলে বন্দরনগরীর জন্য এটি আরও প্রাসঙ্গিক।
দৈনিক সমকাল পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরোর প্রধান জনাব সারোয়ার সুমনকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে জনাব শিমুল তাঁর প্রস্তাবের সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে বলেন, চট্টগ্রামে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আছে। তবে আরও উন্নতির অবারিত সুযোগ আছে। চট্টগ্রামের জন্য একটু বিশেষ মনোযোগ দরকার। দরকার দূরদর্শিতা। নীতিনির্ধারকরা এটি যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন তত লাভ হবে দেশের। চট্টগ্রাম যত উন্নত হবে দেশের অর্থনীতিও তত শক্তিশালী হবে।
তিনি আরো বলেন, সব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। সব মন্ত্রণালয় ঢাকায়। অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষও বসছে ঢাকাতে। শিল্পকারখানা করতে গেলে এখন বেশির ভাগ সময় ছুটতে হচ্ছে ঢাকাতে। সুতরাং চট্টগ্রাম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন ছাড়া কোন বিকল্প নেই।
জনাব আলমাস শিমুলের কথায় যুক্তি আছে। চট্টগ্রাম থেকে যারা এমপি নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রী নিযুক্ত হন, চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়ে তাদের স্মরণাপন্ন হলে তারা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। কারণ মন্ত্রী ও এমপি হিসেবে তাঁদের নিজস্ব চৎরড়ৎরঃু আছে, চট্টগ্রামের উন্নয়নের বিষয় তাদের জুরিসডিকশনের মধ্যে পড়ে না। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করলে চট্টগ্রাম থেকে বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত এমপি জনাব আবদুল্লাহ আল নোমান মন্ত্রী হন। তাঁকে এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের ডিস্ট্রিক্ট মিনিস্টারের মর্যাদা দেয়া হয়েছিলো। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করলে চট্টগ্রাম থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত এমপি জনাব এম এ মান্নান মন্ত্রী নিযুক্ত হন। তাঁকেও এক পর্যায়ে ডিস্ট্রিক্ট মিনিস্টারের মর্যাদা দেয়া হয়। কিন্তু এই জেলা মন্ত্রীরা চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য প্রত্যাশিত কাজ করতে পারেননি। এক সময় জেলা প্রশাসনে চট্টগ্রাম জেলা উন্নয়ন কাউন্সিল নামে একটি ছায়া প্রতিষ্ঠান ছিলো। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই কাউন্সিলের সদস্য হতেন। কিন্তু এগুলি কোনটিই জনাব আসলাম শিমুল যেসব সমস্যার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, সেগুলি সমাধানে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, যিনি এক সময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের একাদিক দফায় মেয়রও ছিলেন, তিনি বন্দর এবং কাস্টমসের আয় থেকে চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য একটা অংশ কর্তন করে রাখার জন্য আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আন্দোলন কোন সুফল বয়ে আনেনি। জনাব শিমুলও বলেছেন, এখানে আছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। আছে দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান কাস্টম হাউস। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনও চট্টগ্রামে। কিন্তু কে শুনে কার কথা।
চট্টগ্রামে এক সময় ব্রিটিশ এবং ইউরোপের বিভিন্ন ব্যবসায়ী তাদের অফিস ও শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন চট্টগ্রামে ওই বন্দর সুবিধার দিকে লক্ষ রেখেই। যেমন গ্ল্যাক্সো, হোয়েকস্ট, জেমস ফিনলে, শ ওয়ালেস, লিভার ব্রাদার্স, বার্জার পেইন্টস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের প্রেস্টিস স্বরূপ ছিলো। সিঙ্গার, ফিলিপসও ছিলো কি না আমার জানা নেই। কিন্তু চট্টগ্রামের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলায় সৃষ্ট নানা সমস্যার মধ্যে শিল্প-কারখানা চালাতে না পারায় তারা চট্টগ্রামে ছেড়ে চলে গেছেন। তারা যেতে চাননি, বাধ্য হয়েছেন। তারা চট্টগ্রামকে ভালোবাসতেন, কারণ চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনুকূল ছিলো।
পাকিস্তান হওয়ার সাথে সাথে ইস্পাহানি সাহেব ভারত থেকে সব ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নিয়ে চট্টগ্রামে চলে আসেন। ইস্পাহানি এখনও চট্টগ্রামেই আছে। অন্যরা একে একে চট্টগ্রাম থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেছে। পাকিস্তান আমলে এশিয়ার বৃহত্তম কাগজকল কেপিএম প্রতিষ্ঠিত হলো বৃহত্তর চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোণায়। বর্তমান বিএসআরএম চেয়ারম্যান আলী হোসেন আকবরালীর পিতা এইচ আকবরালীও তখন চট্টগ্রামে এসে লৌহ শিল্পের স্থাপনা গড়ে তোলেন। উনবিংশ শতাব্দিতে আসাম থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চা-রপ্তানির জন্য ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে স্থাপিত হয়েছিলো।
চট্টগ্রামে এক সময় বিওসির হেডকোয়ার্টার ছিলো। বিংশ শতাব্দির ২য় ও ৩য় দশকে বিওসিতে যে ধর্মঘট হয়, তা’ গোটা ভারতবর্ষ এমনকি ব্রিটেনেও ছড়িয়ে পড়েছিলো। বিওসিরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এবং বিওসির সদর দপ্তর হলো। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বিওসি ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দেশপ্রিয় জে এম সেনগুপ্ত। ৪৭-এর পর বিওসি ট্রেড ইউনিয়নে নেতৃত্ব দেন কাট্টলীর জহুর আহমদ চৌধুরী (পরবর্তীকালে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ৭০-এ পাকিস্তান পার্লামেন্টের মেম্বার (এমপিএ), মুক্তিযুদ্ধকালে পূর্ব্ঞ্চালে মুক্তিযুদ্ধের মূল সংগঠক এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটের মন্ত্রী)। বর্তমানে সদরঘাটে যেখানে পদ্মা অয়েল অবস্থিত, সেখানে ছিলো বিওসি’র বানচাল বা বংশাল।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা চান চট্টগ্রাম থেকে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, দুবাই, মালয়েশিয়া, চীন, হংকং ইত্যাদি গন্তব্যে ফ্লাইটে আসা-যাওয়া করতে। কিন্তু চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এসব গন্তব্যে কোন ফ্লাইট চলাচল করে না। ফলে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের একবার ঢাকা গিয়ে তারপর আবার উক্ত গন্তব্য সমূহের উদ্দেশ্যে ফ্লাইটে আরোহণ করতে হয়। এটি বর্তমানে চট্টগ্রামে শিল্প-বাণিজ্য বিকাশের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
এখন ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা যখন চট্টগ্রামে শিল্প পরিচালনা করতে যান, তখন তাদের কাছে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং রাস্তাঘাটের সমস্যা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। এসব কথা বিবেচনায় আনলে জনাব আলমাস শিমুলের প্রস্তাবকে স্বাগত জানাতেই হয়। তিনি একটি সময়োপযোগী প্রস্তাবই দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করে আমিও বলতে চাই, চট্টগ্রামের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা এখন সময়ের দাবি। হয়তো প্রশ্ন উঠতে পারে, চট্টগ্রামের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করতে গেলে অন্যান্য জেলার পক্ষ থেকেও অনুরূপ দাবি উত্থাপন করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এ যুক্তি দেয়া যায় যে, অন্য কোন জেলায় সামুদ্রিক বন্দর ও বন্দর সংশ্লিষ্ট কাস্টমস নেই। ব্যবসা ও শিল্পকারখানার যে ঐতিহ্য চট্টগ্রামের আছে, অন্য কোন জেলার তা নেই।
ফাইভ স্টার হোটেলও তেমন নেই। রেডিসন ব্লু নামে একটি ফাইভ স্টার হোটেল বছর কয়েক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এরপর আর হয়নি। আন্তর্জাতিক কর্পোরেট ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ফাইভ স্টার, সেভেন স্টার হোটেল উপরিহার্য।

 

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

পটিয়ার রাজনীতির বটবৃক্ষ ভূমিসাৎ

শামসুদ্দিন চলে গেছেন। শামসুদ্দিন ছিলেন অবিভক্ত পটিয়া থানার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রাণপুরুষ। তিনি ছিলেন রাজনীতির প্রতীক। শামসুদ্দিন পটিয়ার রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হতো

বিস্তারিত »

স্বাধীনাত সংগ্রামের নেপথ্য নায়ক এ কে ফজলুল হক

সাতচল্লিশে দেশভাগের পর ঢাকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছিলো, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেদের বুকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দানা বেঁধে উঠেছিলো।

বিস্তারিত »

সব চ্যানেল খোলা: ভারতের সেনাপ্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদী

ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে ‘একাধিক যোগাযোগের চ্যানেল’ খোলা রয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্ষমতায় কী

বিস্তারিত »

জাদুকরি গুণে ১৪ হলুদ দুধ

দুধ খাওয়ার রয়েছে অসংখ্য উপকারিতা। তবে শীতে ঋতু পরিবর্তনের ঠান্ডা আবহাওয়ায় নানা রোগের প্রকোপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে নিয়মিত হলুদ দুধ খাওয়ায় অভ্যাসের বিকল্প নেই

বিস্তারিত »

খালেদা জিয়া পোশাকশিল্পের সত্যিকারের বন্ধু ছিলেন: কাজী মনিরুজ্জামান

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশের পোশাকশিল্পের সত্যিকারের বন্ধু ছিলেন। সুযোগ-সুবিধা ও নগদ প্রণোদনা দিয়ে এ খাতের পথচলা সহজ করে দিয়েছিলেন। তার সময়েই দেশের পোশাক রপ্তানি

বিস্তারিত »

ইউরোপের ৪ দেশের রাষ্ট্রদূতকে জরুরি তলব ইরানে বিরোধীদের সমর্থন করায়

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেওয়ায় যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতদের জরুরি তলব করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব দেশের রাষ্ট্রদূতদের তলব করে

বিস্তারিত »

রুমিন ফারহানার : পথসভার মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ

সরাইল উপজেলায় অরুয়াইল বাজার এলাকায় নিজ গাড়িতে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা সরাইল উপজেলায় তার

বিস্তারিত »

মাটির চুলায় কী রান্না করছেন জয়া আহসান

কনকনে শীতের সকালে গ্রামবাংলার পরিবেশে সময় কাটাচ্ছেন দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, শীতের মোটা কাপড় গায়ে

বিস্তারিত »

মাদুরোকে পাঠানো হলো ব্রুকলিনের বন্দিশিবিরে

নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী/ফাইল ছবি: এএফপি ভেনেজুয়েলার বন্দি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ব্রুকলিনের একটি বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়েছে। এর আগে বিশেষ অভিযান চালিয়ে মাদুরো এবং তার

বিস্তারিত »