সাতচল্লিশে দেশভাগের পর ঢাকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছিলো, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেদের বুকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দানা বেঁধে উঠেছিলো।
স্বপ্নের ঘোরে তারা একে একে অনেকগুলো কান্ড করে ফেলেছিলো, যেমন ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা, ভাষা আন্দোলন, মাউন্টব্যাটেনের স্থলাভিষিক্ত পাকিস্তানের নতুন বড়লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন তাঁর প্রথম ঢাকা সফরে এসে বলতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, তখন তাঁর মুখের ওপর তারা প্রতিবাদ করেছিলো। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ধর্মঘট এবং তাতে যোগ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কারাবরণ, বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রমনার রাজপথে ফুটে থাকা কৃষ্ণচূড়ার লালে তাদের বুকের তাজা রক্ত মিশিয়ে দিয়েছিলো সেই তরুণ বাঙালি ছাত্ররা।
তখনই বাঙালির জাগরণের কবি রমেশ শীল গাইলেন-
“রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি
তোরা ঢাকার শহর রক্তে রাঙাইলি”
বাঙালি তারুণ্যের বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার সেই ভীষণ সময়ে দানবের সাথে সংগ্রামে— সমরে পুলিশের প্রথম গুলিতে টপটপ রাজপথে ঝরে পড়লেন রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত—পাকিস্তানের প্রথম শহীদেরা। আবদুল গাফফার চৌধুরী গান লিখলেন-‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’; চট্টগ্রামে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী লিখলেন-‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’
আবদুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখের সঙ্গে চট্টগ্রামের অধ্যক্ষ আবুল কাশেম, এ কে এম আহসান, এ কে ফজলুল হক ঢাকার সেই বিদ্রোহে সামিল হয়েছিলেন। পটিয়ার অধিবাসী আহসান সাহেব পরে সিএসপি হয়ে পাকিস্তানের আমলা হয়ে যান; ফজলুল হক সাহেব হলেন ‘বাগী’। রাউজানের ভূমিপুত্র, রাউজানের গুজরা গ্রামের ‘বড় মাস্টার’ ওছমান আলী সাহেবের পুত্র ফজলুল হক পড়তে গিয়েছিলেন ঢাকায়— প্রথমে ঢাকা কলেজে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কিংবদন্তী শিক্ষক, ভাষাতাত্ত্বিক, মনীষী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র শিল্পী মুর্তজা বশীর তাঁর বন্ধু। ফজলুল হকের পিতা ওছমান আলী মাস্টার ছিলেন ড. শহীদুল্লাহর বন্ধু। সেই সুবাদে মুর্তজা বশীরের সঙ্গে ফজলুল হকের দোস্তি। মাস্টার সাহেব শিক্ষকতাকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়তে গিয়েছিলেন। তখনই সম্ভবত সতীর্থ ছিলেন ড. শহীদুল্লাহ। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে গ্রেফতারও হয়েছিলেন ফজলুল হক। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে শিল্পী মুর্তজা বশীর লিখেছেন-“১৯৫০ সালে আমি তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। ফজলু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। একসাথে থাকি-খাই-আড্ডায় সময় কাটে। সে সময় হাজং বিদ্রোহ চলাকালে আমারই আঁকা পোস্টার ছিঁড়ে যাওয়ায় জোড়া লাগাতে গিয়ে পুলিশের কাছে গ্রেফতার হলাম। চরম নির্যাতন ভোগ করি। আমার বন্ধুও গ্রেফতার। বিনাদোষে সে কারাভোগ করলো আমার সাথে। এটি এখনো আমাকে কষ্ট দেয়। দু’বন্ধু ভাষা আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হই। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবিদ্ধ বরকতসহ অন্য সহযোদ্ধাদের সাথে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের অনেক বন্ধুর মধ্যে ফজলুল হক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।” ফজলুল হক সাহেবই বোধ হয়, চট্টগ্রামের একমাত্র ব্যক্তি যিনি ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারি গোলাগুলির সময় সেখানে ছিলেন।
ফজলুল হক সাহেবের সাথে শিল্পী মুর্তজা বশীরের সম্পর্ক অটুট ছিলো আজীবন। সে কথা স্মরণ করে তিনি লিখেছেন-“১৯৭১ সালের ৪ নভেম্বর আমি সপরিবারে ফ্রান্সে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ফজলুর সাথে নিবিড় যোগাযোগ ছিলো। মাঝখানে বন্ধ। সে তখন প্রচন্ড ব্যস্ত সময় অতিক্রম করছে।
১৯৭৩ সালের জুনে দেশে ফিরি এবং আগস্টের ১ তারিখে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগে যোগ দিই। তারপর আবার বন্ধুতায় ভাসি আমরা।….ঢাকায় আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আনিসুজ্জামান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, রশিদ চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাকসহ বেশ ক’জন পরবর্তীতে বিদগ্ধ ব্যক্তি ও গুণী শিল্পীতে পরিণত হন। এ.কে ফজলুল হক শেরে বাংলার মতো সমাজসেবা এবং রাজনীতিতেই আমৃত্যু সুনাম রেখে যেতে পেরেছে।
আমার তুই-তোকারী বন্ধু ফজলুল হক গুছিয়ে কথা বলতো। সভা সমিতিতে গেলেও ফিতা কাটতে পছন্দ করতো না, বক্তৃতায় অনীহা ছিলো কিন্তু সে অনলবর্ষী বক্তা ছিলো। তার চমৎকার ভাষাশৈলী ও অসাধারণ উপস্থাপনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো শ্রোতারা। সে ছিলো অনন্য ব্যক্তিত্বের আধার।”
সেই যে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের পাঠ নিলেন ফজলুল হক সাহেব, আর কখনো ভিন্ন পথে হাঁটেননি। কখনো ক্ষমতার জন্য লালায়িত হননি, বিত্তবাসনা জাগেনি অন্তরে; জেল-জুলুম সয়ে আন্দোলন-সংগ্রামের মিছিলে হেঁটে হেঁটে কাটিয়ে দিয়ে গেছেন ক্লান্তিহীন জীবন গণমানুষেরই চারণ এ কে ফজলুল হক।
১৯৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের জন্ম ও ১৯৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগের জন্ম খুব কাছে থেকেই দেখেছেন সে সময় ঢাকাবাসী ফজলুল হক। তাঁর জন্মসন ১৭ জুলাই ১৯৩২; বাংলার ইতিহাসে এই সময়টা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভয়ংকর। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে আরম্ভ হয়েছিলো স্বদেশী আন্দামান, ১৯৩৯-এ আন্দোলন থেকে বিপ্লবীরা একে একে বেরিয়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত এই সময়টা অগ্নিযুগ নামে পরিচিত। তখন মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত তরুণ অরুণ যে আস্তাচলে গিয়েছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। ১৯৩০, ১৯৩১, ১৯৩২— অগ্নিযুগে সর্বাধিক অগ্নি উদগীরণের ঘটনা ঘটেছিল। এই সময় বিপ্লবীরা যেন আগুনের ওপর নৃত্য আরম্ভ করেছিলেন; ১৯৩০-এ মহাবিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ ও জালালাবাদ যুদ্ধ; ১৯৩১-এ নেজামত পল্টনে (পলোগ্রাউন্ড) খেলা দেখার সময় অত্যাচারী দারোগা আহছান উল্লাহকে হত্যা; ১৯৩২-এ উপমহাদেশের প্রথম শহীদ নারী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান রেলওয়ে ক্লাব আক্রমণ করে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন বিপ্লবীরা।
আর এই বত্রিশেই চট্টগ্রামের রাউজান থানার গুজরা গ্রামে বড় মাস্টারের ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিলো যে শিশুটি, তিনিই ফজলুল হক। তখন বত্রিশে জন্মগ্রহণকারী হক সাহেব একাত্তরে বিপ্লবী মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যান। বিপ্লবের আবহে যাঁর জন্ম, বড় হয়ে তাঁর বিপ্লবে দীক্ষা নেওয়াটাই ছিলো স্বাভাবিক ঘটনা; মাস্টারদার উত্তরসূরী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ৭১-এ ‘বাংলাদেশ বিপ্লব’ ঘটিয়ে মাস্টারদার স্বপ্নকেই যেন সার্থক করে তুলেছিলেন।
পূর্বের কথায় ফিরে যাই। চট্টগ্রামে এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, সালারে জিলা শেখ মোজাফফর আহমদ, মওলানা এ আর চৌধুরী, মওলানা আবু তাহের, মওলানা ছালে জহুর, ডা. শামসুল আলম চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ গঠন এবং রাউজানে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, ডা. জাকেরিয়া চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ গঠনের অসম্ভব কাজ সম্ভব করে আবার ঢাকার বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান হক সাহেব; যোগাযোগের সূত্র তো তাঁর ছিলোই। রাউজান ছিলো জাঁদরেল মুসলিম নেতা ফ কা চৌধুরীর ঘাঁটি এবং জন্মস্থান। সেজন্যই বললাম রাউজানে আওয়ামী লীগ গঠন অসম্ভব এবং অসাধ্য একটি কাজই ছিলো।
হক সাহেব যে জাতীয় রাজনীতিতেও অবদান রেখেছিলেন, সেটা এযাবৎ অজ্ঞাতই থেকে গেছে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধে মুজিববাহিনীর চার প্রধানের অন্যতম, সাবেক মন্ত্রী ও এমপি তোফায়েল আহমদের একটি অসমাপ্ত এবং অপ্রকাশিত লেখা পড়ে, হক সাহেব বিভিন্ন সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন সে সম্পর্কে জানতে পারলাম। হক সাহেবের সুযোগ্য পুত্র, লেখক ও কলামিস্ট শওকত বাঙালির কাছ থেকে তোফায়েল আহমদের লেখাটি পাই। তোফায়েল আহমদ নিজেকে হক সাহেবের একজন শিষ্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে লিখেছেন—“তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা। এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৪৮ সালে যখন ভাষা আন্দোলন শুরু হয় তখন তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন অগ্রসেনানী। ১৯৫৪ সালে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন ভাষা আন্দোলনে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অন্যতম অকুতোভয় সৈনিক তিনি। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর তিনি আত্মগোপনে যান এবং অনেকদিন সে অবস্থায় জীবনযাপন করেন। ১৯৬২ সালে আইয়ুবের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে তিনি বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ছিলেন একজন সহজ সরল মানুষ। মূলত: ছাত্রনেতারাই ছিলেন তাঁর টার্গেট। তাঁর রাজনৈতিক বোঝাপড়া এবং ছাত্রনেতাদের সাথে একাত্মতা তাঁকে রাজনৈতিক মহলে জনপ্রিয় নেতায় পরিণত করেছিলো।
আমার সাথে পরিচয়ের সুবাদে তাঁর অসাধারণ পান্ডিত্য এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি তাঁর দ্বিধাহীন আনুগত্য আমাকে মুগ্ধ করে, প্রেরণা যোগায়। তাঁর সাথে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। আমি তাঁর গুণমুগ্ধ অনুসারীতে পরিণত হই।
আমাদের সময়ে সংগঠনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দিলে আমি যখন হতাশাগ্রস্ত হতাম তখন মরিয়া হয়ে তাঁকে খুঁজে ফিরতাম। তিনি আমার হতাশা কাটিয়ে উঠে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার তাগিদ দিতেন।
যখনই তাঁর সাথে দেখা হয়েছে তখনই এদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং আওয়ামী রাজনীতিকে তৃণমূলে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় সে বিষয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করতেন।
বস্তুত আমার রাজনৈতিক জীবনে তাঁর মতো সহজ-সরল হৃদয়বান এবং খাঁটি দেশপ্রেমিক এই পরশ পাথরের সংস্পর্শ না পেলে আমি তোফায়েল হয়ে উঠতাম না।”
কখন কিভাবে তিনি ফজলুল হকের শিষ্য হলেন, সে ইতিহাস বর্ণনা করতে যেয়ে তোফায়েল আহমদ বলেন, “৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অমর নায়ক আমাকে অভিহিত করেন যারা তাদের জানা উচিত সে উত্তাল সংগ্রামের মহানায়কদের অন্যতম এ কে ফজলুল হক। ১৯৫৭ সালে আমার রাজনীতির প্রথম পাঠ; ছিলাম ভোলার ‘সরকারি হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র’। প্রাদেশিক পরিষদের একটি উপ নির্বাচন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভোলা সরকারি কলেজ মাঠে জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা আমার মনে রেখাপাত করে এবং সিদ্ধান্ত নিই জীবনে কখনো রাজনীতি করলে এই নেতার পেছনেই করবো। সে ভাবনায় যখন আচ্ছন্ন হলাম ঠিক সে সময়ে একজন ব্যক্তি আমাকে ইশারায় ডাকলেন, মাঠ পর্যায়ের খবর জানতে চাইলেন আমার মতো দুগ্ধপোষ্য এক তরুণ বালকের কাছে। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করি যতটুকু একজন স্কুল পড়ুয়া বালকের চোখে দেখা যায়।
সেই থেকে যোগাযোগ এ কে ফজলুল হক-এর সাথে। আমার সাথে তার নিয়মিত পত্র যোগাযোগ ছিলো। ১৯৬০ সালে যখন এসএসসি পাশ করি এবং ’৬২ সালে আইএসসি পাশের পর নিয়মিত সরাসরি যোগাযোগ। রাজনীতির অ-আ পাঠ নিই এই মহান রাজনৈতিক গুরুর কাছে। তিনি ছিলেন জাতীয় নেতাদের নেতা। বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে অন্ধ-বধির। বঙ্গবন্ধুর সরাসরি গুপ্তচর।
বীর প্রসবিনী চট্টগ্রামের অমর সন্তান ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মেধাবৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির চর্চা ছিলো তার অন্যতম পরিচালক ছিলেন। তাঁর মেধার বিচ্ছুুরণ ঘটেছে জাতীয় রাজনীতিতে। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তিনি দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা হতেন এ কথা হলফ করে বলতে পারি।”
৬৯-এর গণ আন্দোলনে হক সাহেবের ভূমিকা সম্পর্কে তোফায়েল আহমদ বলেন, “আন্দোলনের সূচনা থেকে সফলতা পর্যন্ত যে ক’জন বিরল, বিদগ্ধ এবং সাহসী রাজনীতিকের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিলো আমার গুরু এ.কে ফজলুল হক তাঁদের অন্যতম। বঙ্গবন্ধুর গুপ্তচর ব্যক্তিটি আমার ‘গুপ্তধন’। সেই ১৯৫৭ সাল থেকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে যিনি জীবনের ঝুঁকিটাকে উপেক্ষা করে তাঁর শিষ্যকে নিরাপদ রেখেছেন।
তাঁরই পরামর্শে আমাদের সহযোগি ও অন্যান্য ছাত্র প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করেছি। আমরা আলোচনা করেছি তথাকথিত আগড়তলা মামলা সাজিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝোলানোর ষড়যন্ত্র করছে আইয়ুব এবং তার সহচররা। যে কোন মূল্যে এই ষড়যন্ত্র বানচাল করে রুখে দাঁড়াতে হবে। বাঙালি জাতিকে একতাবদ্ধ করে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে যে ঘোষণাপত্র পাঠ করি সেটির প্রতিটি শব্দ এ.কে ফজলুল হকের লেখা। ….. গুরুর পরামর্শে এবং সবার সিদ্ধান্তে আমরা এ বিষয়ে অনেক নেতার কাছে গিয়েছিলাম সমর্থন আদায়ের আবেদন নিয়ে।
ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটির (ডাক) সভা চলছিলো আহমেদুল কবির সাহেবের বাসায়। আমাদের সমস্ত আলোচনা শেষে বলতে গেলে সরাসরিই প্রত্যাখ্যান করলেন।
ইতোমধ্যে ফজলুল হক সাহেব সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের সাথে প্রাথমিক আলাপ সেরে রেখেছেন।
প্রত্যাখ্যাত আমরা সেদিনই সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে গেলে, অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি আমাকে বুকে টেনে নিলেন। বললেন, ‘আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আমরা ছাত্রদের এগারো দফার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছি। তোমরা এগিয়ে যাও। তোমরা একা নও, তোমাদের পাশে আর কেউ থাকুক না থাকুক আওয়ামী লীগ থাকবেই।’
সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমাকে ফেরার পথে এ.কে ফজলুল হকের দূরদর্শিতার কথা জানালেন। অনন্য অসাধারণ ভূমিকার কথা বললেন। জোর দিয়ে বললেন, এটির সফলতা আসবেই। এই প্রচারবিমুখ মানুষটি কোনদিনই আলোতে আসতে চাইতেন না, চাইতেন শুধু সবাইকে আলোকিত করতে।
পরবর্তী গন্তব্য মাওলানা ভাসানী। ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি তাঁর কাছে গেলে তিনি কতক্ষণ গম্ভীর থেকে বললেন, পরবর্তী মাসের ৮ ফেব্রুয়ারি খুলনার ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেবেন আমাদের ১১ দফা সমর্থন করবেন কী না।
গুরুর রাজনৈতিক কারিশমায় এবং আমাদের আন্দোলনের আপসহীনতা, দ্বিধাদ্বন্দ্বহীন, উত্তালতা ও সফলতা পর্যবেক্ষণ করেই তারা আমাদের সমর্থন করতে আন্তরিকভাবে এগিয়ে এসেছিলেন সম্মেলনের আগেই।….”
হক সাহেব সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর কাছে যা’ শুনেছিলেন তোফায়েল আহমদ, “১৯৬৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জনসভার পূর্বে তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুর রউফসহ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আমাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত করতে গেলেন। আমি যখন দ্বিধাহীন এবং বঙ্গবন্ধুর সামনে দাঁড়াতে পারবো কীনা সেসব নিয়ে শংকিত তখন বঙ্গবন্ধু আমাকে জড়িয়ে ধরে আপ্লুত কণ্ঠে বললেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি জনসভায় বক্তৃতা করতে। আমি সাহস নিয়ে বলেছিলাম, এটা তো আমাদের প্ল্যাটফর্ম নয়। তিনি বলেছিলেন, সমগ্র বাংলাদেশই আজ তোদের প্ল্যাটফর্ম। কানে কানে বললেন, ফজলুল হক সাহেবের কথা। নিজের অন্ধকার কুটুরীতে বসেও প্রতিটি বিষয় যেনো বঙ্গবন্ধুর নখদর্পণে।
১৯৬৯ এর ২২ ফেব্রুয়ারি বেলা দশটা কি এগারটা নাগাদ খবর এল মুজিব ভাই ছাড়া পেয়েছেন। আগরতলা মামলাও প্রত্যাহার করা হয়েছে। পল্টনের অনির্ধারিত সভা বাতিল করে পরদিন রেসকোর্স ময়দানে গণসংবর্ধনার সিদ্ধান্ত বাতলে দিলেন এ.কে ফজলুল হক। তিনি মুজিব ভাইকে বুঝিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে দিলেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে গণসংবর্ধনার আয়োজন করে। এ আয়োজনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি জননেতা এ.কে ফজলুল হক। প্রকাশ্যে সিরাজুল আলম খান, জেল থেকে শেখ মণি, আবদুর রাজ্জাক এর যথেষ্ট সহায়তা, বুদ্ধি-পরামর্শ পেলেও নেপথ্যের মূল মানুষটি ছিলেন এ.কে ফজলুল হক। কোথাও কোন জটিলতা কিংবা অসহযোগিতায় তিনিই আমার মূল শক্তি।…
..আমার রাজনীতির দীর্ঘসময়ে (যতদিন তিনি বেঁচেছিলেন)। তিনি সবসময়েই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সত্যিকার অর্থে একজন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা ছিলেন এ.কে ফজলুল হক।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে যারা নেপথ্যে অভূতপূর্ব ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন তিনি তাদের অগ্রণীজন।
বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার সুবাদে দেখেছি ফজলুল হককে তিনি আদর-স্নেহে ভালোবাসতেন। বিশ্বাস করতেন। আর ফজলুল হক বঙ্গবন্ধুকে অন্ধভাবে শ্রদ্ধা-সম্মান-করতেন। বাংলার মানুষকে ভালোবাসতেন।”
হক সাহেব প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম একজন নেপথ্য নায়ক ছিলেন। মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। নায়ক আরো ছিলেন, যেমন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান, চট্টগ্রামের এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, সালারে জিলা শহীদ শেখ মোজাফফর আহমদ, আমীর হোসেন দোভাষ, মানিক চৌধুরী, এম এ হান্নান, আবদুল্লাহ আল হারুন প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতা এবং ছাত্রনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ। এই নামের সঙ্গে এ কে ফজলুল হকের নামও যুক্ত হবে। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ৬ দফা তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত স্বাধীনতা সংগ্রামের অত্যন্ত ভিতরের মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন ধূপের ন্যায়, ধূপ যেমন নিজে পুড়ে অন্যকে গন্ধ দেয়, এ কে ফজলুল হকও তেমনি নিজেকে নিঃশেষে নিংড়ে নিজের স্বেদ, রক্ত দিয়ে জাতির রক্ত প্রবাহ সচল রেখেছিলেন। নেপথ্যের কুশীলবরা সব সময় অজ্ঞাত থেকে যান। তাদের ওপর পাদপ্রদীপের আলো পড়ে না। কিন্তু তাতে তাঁদের মহত্ত বা গুরুত্ব মোটেই খাটো হয় না। হক সাহেবের তিরোধানের পর ৩৯ বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে তিনি প্রায় বিস্মৃত হয়ে গেছেন। জীবিত থাকতেও তিনি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে কত বড় ভূমিকায় নিয়োজিত ছিলেন, আওয়ামী লীগকেও তিনি কতভাবে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, সেটা কেউ জানতো না, জানার চেষ্টাও করেননি। জানাতে চাননি তিনি নিজেও। কারণ আত্মপ্রচার তাঁর ধর্ম নয়, প্রচারমুখি মানুষ ছিলেন না তিনি ।
শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে নিয়ে যে স্মৃতিচারণ করেছেন, তাতে আরেক ফজলুল হকের ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন—‘১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকালে এ.কে ফজলুল হকের সাথে আমার পরিচয়। পরবর্তীতে সখ্যতা। সেই সখ্যতা আরো প্রগাঢ় হয় ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের মধ্য দিয়ে।’
তিনি বলেন, ‘১৯৬৯ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত চট্টগ্রামে অবস্থানকালে ফজলুল হক সাহেবের সাথে আমার নিবিড় বন্ধুতা চলমান ছিলো। এর মধ্যে যুদ্ধকালীন তথা ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ আমরা কু-েশ্বরী ভবনে আশ্রয় গ্রহণ করি। সে সময়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি পশ্চিম গুজরায় বেশ ক’বার যাওয়া-আসা করেছি নানাভাবেই। আমাদের অনেকেই তাঁর সাথে গভীর যোগাযোগ রাখতেন। তিনি পরম বন্ধুবৎসল এবং আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন। যুদ্ধকালীন রাউজানে তাঁদের বাড়ি ‘ওছমান আলী মাস্টার বাড়িতে ছিলো স্বীয় ইউনিয়নের প্রধানতম সেল্টার হাউস। তিনি সেল্টার মাস্টার হিসেবে রাউজানে স্ব-নামে খ্যাত ছিলেন। নিজেদের বাড়ি ছাড়াও হাটহাজারী-রাউজানের অসংখ্য সেল্টার হাউস তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়।
মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী রাজনীতি এবং বহুমাত্রিক সমাজকর্মে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন ফজলুল হক। মৃত্যুর বছর খানেক আগে ঢাকার বাসায় এলে একবার দেখা ও নানা বিষয়ে কথা হলেও রাজনীতির প্রতি কিছুটা অভিমান জমা হয়েছিলো বলে আমার ধারণা হয়। আধুনিক মানুষ ও জনদরদী এ.কে ফজলুল হককে শুদ্ধ রাজনীতির অভিভাবকতুল্য নেতা হিসেবে গণ্য করা যায়। আমরা একেবারে ঢাকা ফিরে গেলেও যোগাযোগহীনতা হয়েছে ঠিকই, তবে আন্তরিকতা বজায় ছিলো আমৃত্যু।”
ভাষাসৈনিক, রাজনীতিবিদ, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠক ও লেখক অ্যাডভোকেট গাজীউল হক লিখেছেন— “১৯৫১ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ আমরা গঠন করি সে সময়ে এ.কে ফজলুল হক আমাদের কাছে আসেন এমএ ওয়াদুদ-এর একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে এবং ঐ বছরই যুবলীগের প্রতিষ্ঠাকালেই তাঁর সাদামাটা কথা, আন্দোলনের প্রতি ঐকান্তিকতায় আমরা মুগ্ধ হই। পরবর্তীতে ওয়াদুদ-এর সাথে প্রায় নিয়মিতই তাঁকে আমরা নানা কাজে পেয়েছি নিঃস্বার্থভাবে। মূলত: ভাষাবীর এবং রাজনীতিক এমএ ওয়াদুদ পাটোয়ারীর ঘনিষ্ঠ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র হিসেবে ফজলুল হক আমাদের চলার পথে অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে ওঠে। সেই দুর্দান্ত সময়গুলিতে এবং পরবর্তীতে নানা দুঃসময়ে এ.কে ফজলুল হক ছিলেন অনেকের কাছে অনেকটা নির্ভরতার প্রতীক।
সত্যি বলতে, আওয়ামী মুসলিম লীগের অসাম্প্রদায়িককরণের মাধ্যমে ‘আওয়ামী লীগ’ নাম ধারণ এবং দেশের সব ধর্ম সম্প্রদায়ের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠনে বিবর্তন ও ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিপক্ষে একটি সত্যিকার গণসংগঠনে রুপ দেওয়া ও মুসলিম লীগ-স্বৈরশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য বিপুল সাংগঠনিক কার্যক্রম ও সমাবেশ, সভা-মিছিল সংগঠন সবকিছুর ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি ভাষাসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ.কে ফজলুল হকের যে ত্যাগী, একনিষ্ঠ ও বলিষ্ঠ কর্মী ও সংগঠকের ভূমিকা ছিল তা নেতা-কর্মী সবার স্বীকৃতি লাভ করেছিল।
ভাষা সৈনিক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে— “১৯৫০ সালে আণবিক বোমা নিষিদ্ধকরণের দাবিতে গঠিত বিশ্বশান্তি পরিষদের চট্টগ্রাম শাখায় তাঁদের সাথে ফজলুল হক ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫১ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সংস্কৃতি সম্মেলনে তিনি অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা এবং সাংগঠনিক সম্পাদক। ফজলুল হক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও বিরামহীন কাজ করেছেন ”। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সংস্কৃতি সম্মেলনে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিনিও যোগ দেন।
স্থানীয় ঈদগাহ প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি পর্যায়ক্রমে বিনাজুরি নবীন উচ্চ বিদ্যালয় ও আবুরখীল অমিতাভ উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক পড়াশোনা করে ১৯৭১ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এ সময় তিনি পিতাকে অনুসরণ করে কিছুদিন শিক্ষকতার ব্রত গ্রহণ করেন, কাগতিয়া প্রাইমারি স্কুল তাঁর প্রথম কর্মক্ষেত্র।
এর মধ্যে পারিবারিক চাপে তাঁকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। নিজ এলাকার আরেক শিক্ষানুরাগী পরিবারের খলিল আহমদ মাস্টারের বড় ভাই সেকান্দর হোসেন সারাং-এর একমাত্র মেয়ে মোছাম্মৎ লায়লা বেগমের পাণিগ্রহণ করেন তিনি। বিয়ের পর তিনি অনেকটা গণ্ডিবদ্ধ জীবনে ফিরে আসেন। কিন্তু তাঁর সৃজনশীল প্রতিভা প্রতিনিয়ত মানব কল্যাণের জন্য তাঁকে হাতছানি দেয়।
৭০-এ সংসদ নির্বাচনে রাউজান থেকে আওয়ামী লীগের মনোনিত প্রার্থী অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ও আবদুল্লাহ আল হারুনকে বিজয়ী করার জন্য ফজলুল হক অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। অধ্যাপক খালেদের নির্বাচনী প্রচারণার শেষের দিকে একটি গণমিছিলের আয়োজন করা হয়। মিছিলের কর্মসূচি ছিল রাউজান সদর থেকে মিছিল শুরু হয়ে হাফেজ বজলুর রহমান সড়ক হয়ে পাহাড়তলী অতিক্রম করে গশ্চি নয়াহাট, নোয়াপাড়া, বদুমুন্সিপাড়া, রামচন্দ্র বাজার, মগদাই বাজার ও কাগতিয়া বাজার হয়ে পুনরায় রাউজান সদরে গিয়ে শেষ হবে। নির্ধারিত কর্মসূচি মোতাবেক রাউজান সদরে প্রত্যেক ইউনিয়ন থেকে নেতা-কর্মীরা এসে জমায়েত হয়। সেখান থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের নেতৃত্বে বিশাল মিছিল জলিলনগর বাস স্ট্যান্ড হয়ে হাফেজ বজলুর রহমান সড়ক বেয়ে পাহাড়তলীর দিকে এগিয়ে যায়। পথিমধ্য সোমবারের হাট, ইয়াছিন ভট্টের হাট, পরীর দীঘির পাড়ে পথসভায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক খালেদ । পাহাড়তলী চৌমুহনীতেও পথসভা করে গশ্চি নয়াহাট হয়ে নোয়াপাড়া পথের হাটে মিছিলটি এসে এক সংক্ষিপ্ত জনসভা হয়। তখন সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। জনসভা শেষে মিছিলটি রাউজান-নোয়াপাড়া সড়ক দিয়ে বদুমুন্সিপাড়া ও রাম বাজার অতিক্রম করে যখন মগদাই ব্রীজ পার হচ্ছিল তখন রাতের ঘনকালো অন্ধকারে চারিদিক ঢেকে গেছে। মিছিলের অগ্রভাগটা শ্যামাচরণ উচ্চ বিদ্যালয় ছেড়ে গেছে। পশ্চাতভাগের কিছু ব্রীজের উপর আর কিছু অংশ ব্রীজের দক্ষিণ পাড়ে রয়েছে। এমন সময় মিছিলের পশ্চাতভাগে ফজলুল কাদের চৌধুরীর কিছু উচ্ছৃংখল কর্মী সমর্থক অতর্কিত হামলা চালিয়ে মিছিলকারীদের এলোপাতারি পিঠাতে থাকে। এতে অনেকে আহত হয়, তখন খবর পেয়ে ফজলুল হক মিছিলের অগ্রভাগ থেকে বিদ্যুৎবেগে মগদাই বাজারে পৌঁছে যখন হুংকার দিয়ে উঠলেন তখন সন্ত্রাসীরা তাঁর ভয়ে পালিয়ে যায়। কারণ তারা হক সাহেবকে কমান্ডার হিসাবে জানত। এরপর তিনি আহতদের সবাইকে নিজের বাড়িতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলে প্রত্যেককে যার যার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। এরকম নানা কারণে হক সাহেব অধ্যাপক খালেদ-এর নিকট ছিলেন অত্যন্ত আস্থাভাজন। সেদিন রাত ১২টার পর থেকে নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হক সাহেবের কর্মতৎপরতা বেড়ে গেলো। তিনি একদিকে খালেদ সাহেবের সাথে থেকে কেন্দ্রভিত্তিক তালিকা তৈরি করে এজেন্ট নিয়োগের ফরম ভাগ করছেন অন্যদিকে নিজে ও অন্যান্য নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে সেই এজেন্ট ফরমগুলি প্রতিটি কেন্দ্রের এজেন্টদের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন। ৬ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে হক সাহেব আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সাথে নিয়ে কেন্দ্র পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। ৭ ডিসেম্বর অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হল। নির্বাচনে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
তারপরের ঘটনা সবার জানা। ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের রায় মানতে অস্বীকার করে এবং ঢাকায় সংসদ অধিবেশন ডেকেও স্থগিত করেন। এতে সমগ্র বাংলাদেশ ফুঁসে উঠে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলে ২৫ মার্চ সে আন্দোলন চলে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক, কামান, মেশিনগান ইত্যাদি বাঙালি জাতিকে নির্মূল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। হক সাহেব রাউজান মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে সংগঠিত করতে লাগলেন। তাঁর বাড়িতে রাউজানের প্রথম ও প্রধান সেল্টার স্থাপন করেন।
একসময় তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। তার বেশ কিছুদিন পর হক সাহেব বদলি হয়ে কক্সবাজার চলে যান। সেখানে দীর্ঘদিন চাকরি করার পর ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোদমে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন।
ফজলুল হক ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্সে ভর্তি হন।
স্বাধীনতার পর প্রথম ইউপি নির্বাচনে তিনি বিনাজুরির প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
হক সাহেবরা ৫ ভাই ৪ বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি সবার বড়। মেজো এনামুল হক মুন্সি, সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। সেজো আনোয়ারুল হক মানিক প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার ছিলেন, ৪র্থ মুজিবুল হক এর নিজস্ব ওয়ার্কশপ এবং ছোট এমদাদুল হক নিজের মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত আলমাচ হজ্জ্ব কাফেলার চেয়ারম্যান। বোনদের মধ্যে সবার বড় মরহুমা আনোয়ারা বেগম, মেজো মরহুমা মোহছেনা বেগম, সেজো সুলতানা বেগম এবং ছোট সাজেদা বেগম। ওছমান আলী মাস্টারের তৃতীয় প্রজন্মের অনেকেই সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব, ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন জায়গায় আলো ছড়াচ্ছেন।
এ.কে ফজলুল হক চেয়ারম্যান-এর সহধর্মিণী বেগম লায়লা হক সামাজিক কর্মযজ্ঞে একজন নিবেদিতপ্রাণ বিদূষী ছিলেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে রাউজানে ‘হযরত আলহাজ্ব ওছমান আলী মাস্টার রহ.-এর বাড়ির শেল্টার হাউজ’ তত্ত্বাবধায়ক, বীরনারী সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন-সংস্থা কর্তৃক ‘রত্নগর্ভা মা’ সম্মাননায় ভূষিত-সংবর্ধিত হন। বেগম লায়লা হক ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন।
হক সাহেবের ৪ ছেলে ও ৫ মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে সিভিল প্রকৌশলী শওকত ওসমান কুয়েত মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্সে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে কর্মরত প্রথম বাংলাদেশী। মেজো ছেলে সফটওয়্যার প্রোগ্রামার শওকত হোছাইন কুয়েত-অ্যামেরিকান যৌথ কোম্পানী ৮০০’র কম্পিউটার প্রোগ্রামার এর চাকরি ছেড়ে বর্তমানে কাতারে ব্যবসা করছেন। সেজ ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ-যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী লেখক-সাংবাদিক শওকত বাঙালি দেশের বিভিন্ন শীর্ষ পত্রিকায় কাজ করার পর বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমানের সাবেক পলিটিক্যাল এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বর্তমানে তরুণ শিল্পোদ্যোক্তা। দেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড আর্ট-এর নির্বাহী পরিচালক। এছাড়া এলিট মিডিয়া লিমিটেড এর পরিচালক তিনি। ছোট ছেলে আলহাজ্ব শওকত আল আমিন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিসংখ্যানবিদ। বড় মেয়ে শিরিন হক রাউজান কন্ঠ সম্পাদক, মেজো মেয়ে শাহীন আকতার প্রতিষ্ঠিত শিল্পোদ্যোক্তা ‘খানাদানা’ ফুড ব্র্যান্ডের সত্ত্বাধিকারী, সেজ মেয়ে স্কুল শিক্ষিকা তোহিন আকতার বর্তমানে অনলাইন পোষাক বিক্রয় প্রতিষ্ঠান নতুনত্ব’র সত্ত্বাধিকারী, ৪র্থ শামীন আকতার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের বক্ষব্যাধীর লেডি হোম ভিজিটর এবং ছোটমেয়ে শারমিন আকতার কচি আবুল খায়ের গ্রুপে এইচআর’এ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভাই-বোন সবার ছোট কচি ইতোমধ্যে মারা গেছেন।
বড় পুত্রবধূ শায়লা ওসমান কুয়েতে শিক্ষকতা পেশায়, মেজো আকলিমা আকতার ‘স্বপ্নপুরী’ ফ্যাশনের সত্ত্বাধিকারী সেজো শাহীন আকতার তাহা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিয়ামক দপ্তরে এবং ছোটজন নূরী জান্নাত রুম্পা গৃহিণী। কন্যার জামাতাদের মধ্যে ব্যবসায়ি, প্রবাসী, চাকুরিজীবী ও প্রকৌশলী রয়েছেন।






