মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ধরা পড়ার পর এখন যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’। তবে এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন এবং মার্কিন সংবিধান উভয় দিক থেকেই নজিরবিহীন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, যদি মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ তাদের নির্দেশ মেনে চলে, ভেনেজুয়েলায় সরাসরি সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হবে না। তবে দেশটির তেল-সংশ্লিষ্ট স্বার্থ রক্ষা করতে গেলে সৈন্য পাঠাতে তিনি ‘ভীত নন’ বলে জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই বক্তব্যকে বৈধতার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে সরাসরি ‘চালাতে’ পারে না, কারণ এটি জাতিসংঘের সনদের ধারা ২(৪) অনুযায়ী বলপ্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে, যদি না জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন থাকে বা আত্মরক্ষার কারণ থাকে, যা এখানে নেই । ‘আইনসঙ্গত সরকারের’ সম্মতির বিষয়টিও বিতর্কিত। কারণ মাদুরোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, তাই এটি একটি ‘অবৈধ দখল’ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন কোনো ক্ষমতা নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
কার্ডোজো স্কুল অব ল’-এর অধ্যাপক রেবেকা ইংবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভেনেজুয়েলা পরিচালনার কোনো বৈধ পথ নেই। এটি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ দখল এবং মার্কিন সংবিধানেও প্রেসিডেন্টের একার ক্ষমতার বাইরে।
জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য দেশের ভূখণ্ডে অনুমতি ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। মাদুরোকে ধরে আনা এটিকে স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে দেখায়।
১৯৮৯ সালে পানামার নরিয়েগা অভিযানেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ ধরনের পদক্ষেপকে ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল’র একটি মূখ্য নিয়ম: কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে কোনো বাহিনীর সহায়তায় ঢুকে পরিচালনা বা ‘শাসন’ করতে পারে না। সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ বা শাসনের চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির বিপরীত। সূত্র: জাস্টিয়া।
তবে, ইউএন কার্টারে যদি কোনো দেশকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে অনুমতি দিতে হয়, তবে তা শুধু দুইভাবে সম্ভব: ১ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) অনুমোদন, যা কোনো বাধ্যতামূলক আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া দেওয়া হয় না।
২. স্বকীয় আত্মরক্ষা (আর্টিকেল-৫১), যদি কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আসন্ন বা বাস্তব ‘সশস্ত্র আক্রমণ’ হয়, তবে তা আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে সীমিতভাবে বিবেচিত হতে পারে।
আইনবিদদের মতে, ধারা ২(৪) মূলত সামরিক শক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা সাইবার আক্রমণের মতো অসামরিক চাপ সাধারণত এর আওতায় পড়ে না। তবে এসব ক্ষেত্রেও জাতিসংঘ সনদের অন্যান্য বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
জাতিসংঘ সনদ শক্তি প্রয়োগের দুটি সীমিত ব্যতিক্রম স্বীকৃতি দেয়। প্রথমত, ধারা ৫১ অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র সশস্ত্র আক্রমণের শিকার হলে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে নেওয়া পদক্ষেপ অবশ্যই প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে এবং তা নিরাপত্তা পরিষদকে জানাতে হয়। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সমবায় সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষকদের মতে, মানবিক হস্তক্ষেপ বা বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের সুরক্ষার অজুহাতে একতরফাভাবে শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি জাতিসংঘ সনদে স্পষ্টভাবে অনুমোদিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব যুক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা কৌশলগত উদ্দেশ্য আড়াল করার অভিযোগও ওঠে।
ফলে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন বা আত্মরক্ষার সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে অন্য দেশের ভূখণ্ডে সামরিক শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলেই বিবেচিত হয়।
ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতিতে কোনো সশস্ত্র আক্রমণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। যে কারণে, ভেনেজুয়েলা চালানোর যে বিষয়টি ট্রাম্প বলছেন, সেটি যৌক্তিক নয়।
মার্কিন আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে, প্রেসিডেন্ট কখনও কখনও ‘সহজাত সুরক্ষা ক্ষমতা’ ব্যবহার করে বিদেশে ফৌজদারি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেন। ১৯৮৯ সালের পানামা অভিযানেও এ ধরনের যুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল।
মার্কিন জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, মাদুরোকে ধরে আনার সময় হেলিকপ্টারগুলো ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছিল। সেনাদের ‘সহজাত আত্মরক্ষা ক্ষমতা’ প্রয়োগ করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তাকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি ঘোষণা করেছেন, সিলিয়া অভিযুক্ত, তাকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
আন্তর্জাতিক আইনে সাধারণভাবে রাষ্ট্রপ্রধানদের বিদেশি আদালতে ছাড় দেওয়া হয়। তবে মাদুরোর ক্ষেত্রে এটি জটিল। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন মাদুরোকে বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। মার্কো রুবিওসহ ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ‘মাদক পাচারকারী ও সরকারের ছদ্মবেশে থাকা নেতা’ হিসেবে দেখছেন।
কার্ডোজো স্কুলের অধ্যাপক ইংবারের মতে, এটি সুপ্রিম কোর্টে গেলে বিচারক হয়ত এই রায়ই দেবেন যে, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়মুক্তি বাতিলের স্বার্থে মাদুরোকে স্বীকৃতি না দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাম্পের আছে। আর তাই ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে মাদুরো রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কোনো ছাড় পাবেন না।







