আজ: বৃহস্পতিবার ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

নারীকে সাংবাদিকতায় এনে পূর্বকোণের ইতিহাস সৃষ্টি পথিকৃৎ নারী সাংবাদিক ডেইজী ও নাজনীন : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

দু’জন নারী সাংবাদিক তাঁদের জীবনকালেই ইতিহাস হয়ে গেছেন। তাঁরা এখনো পেশায় লিপ্ত আছেন। এই দু’নারী হচ্ছেন-শাহীন আরা বেগম ও নাজনীন বেগম। শাহীন আরা ডেইজী মউদুদ নামে সমধিক প্রসিদ্ধ। শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ওহীদুল আলমের শিল্পীপুত্র মউদুদুল আলমের সঙ্গে পরিণয়ের পর তিনি ডেইজী মউদুদ নাম ধারণ করে সে নামেই নিজেকে পরিচয় দিতে থাকেন। ডেইজী সম্ভবত তাঁর সংক্ষিপ্ত ঘরোয়া নাম। ডেইজীর পিতাও বিখ্যাত মানুষ। তিনি গহিরা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং রাউজান কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন।
নাজনীনের পৈতৃক নিবাস কাট্টলী। দৈনিক সংবাদ ও আজাদী-খ্যাত অধুনা প্রয়াত সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ ইউসুফ তাঁর নিকট সম্পর্কের বড় ভাই (মামাত ভাই) এবং ১৯৮৬ সালে দৈনিক পূর্বকোণের যাত্রালগ্নে ডেইজীর সঙ্গে পত্রিকাটির বার্তা বিভাগে কর্মে নিযুক্তিকালে নাজনীন ইউসুফ ভাই’র আলকরণের বাসায় থাকতেন। ছোটবেলায় পিতা মারা গেলে নাজনীন ও তার ভাই ইউসুফ ভাই’র বাসাতেই প্রতিপালিত হন। নাজনীন পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার পর পূর্বকোণের চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে তাঁর কর্মস্থলে চলে যান। নাজনীন বর্তমানে ঢাকায় দৈনিক জনকণ্ঠে কর্মরত আছেন।
ডেইজী ছিয়াশিতে সহ-সম্পাদক পদে পূর্বকোণের সাংবাদিকতায় নিয়োজিত হয়ে অদ্যাবধি সেখানে কর্মরত আছেন। ডেইজী একই পত্রিকায়, টানা ৩৩ বছর সাংবাদিকতা করার গৌরবময় রেকর্ড স্থাপন করেছেন। পূর্বকোণের সহকারী সম্পাদক স্বপদ দত্ত (কবি স্বপন দত্ত) একই রেকের্ডর অধিকারী। আরো চার সাংবাদিক রোকসারুল ইসলাম, প্রভাত বড়–য়া, রণজিৎ দে, গোলাম সরওয়ারও সম্ভবত তিন দশক কাটিয়ে দিয়েছেন পূর্বকোণে। অন্য বিভাগে তাপস নন্দী, রাশেদুল আলম, চন্দন শীল, রতন, অপু বড়–য়া, কাঞ্চন শীল, অরূপ, হাশেম ও তার ভাই আলমগীর সম্ভবত প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে পূর্বকোণের সঙ্গে লেগে আছেন।
চট্টগ্রামের সাংবাদিকতার ইতিহাস ঘাঁটলে ডেইজী ও নাজনীনের অগ্রবর্তী দু’টি নাম পাওয়া যাবে। তাঁরা হচ্ছেন সাধনা-খ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর স্ত্রী আয়েশা খানম এবং রাজনীতিক, সাংবাদিক ও দেশব্রতী লোকমান খান শেরওয়ানীর পতœী শবনম খানম শেরওয়ানী। আবদুর রশিদ সিদ্দিকী তাঁর পতœীকে সম্পাদক করে আন্বেষা বা অন্বেষা নামে একটি সাময়িকী প্রকাশ করেছিলেন। শনবম খানম শেরওয়ানী ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক সম্পাদিত কোহিনূর-এ কিছুদিন কাজ করেছেন। কিন্তু আয়েশা খানম নামমাত্র সম্পাদক এবং শবনম খানমের কর্মস্থল কোহিনূর সাময়িক পত্র ছিলো মাত্র এবং তাঁকে অফিসে বসে কাজ করতে হতো না। শবনম ডেইজীর মামী শাশুড়ি। সেজন্য এই দু’জনকে নিয়মিত সাংবাদিকের বাইরে রেখে ডেইজী ও নাজনীনকে আমি নারী সাংবাদিকতার পথিকৃতের মর্যাদা দান করতে চাই।
ডেইজী ও নাজনীন দিনের পর দিন রাতের পর রাত পত্রিকা অফিসে হাজিরা দিয়ে পুরুষ সাংবাদিকদের সঙ্গে টেবিলে বসে সাংবাদিকতা করেছেন। তাঁরা সকাল, বিকেল ও নৈশ পালায়ও কাজ করেছেন? সেজন্য আমি বলতে চাই, তাঁরা সাংবাদিকতায় নারীর আগমনের অগ্রদূত। দৈনিক পূর্বকোণও চট্টগ্রামের সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রথমবারের মত নারী সাংবাদিক নিয়োগ করে পথিকৃৎ হয়ে থাকলো।
ডেইজী ও নাজনীন নারী সাংবাদিকতার যে ধারার সূচনা করলেন, পরবর্তীকালে সেই পথে হাঁটতে খুব বেশি নারীর আগমন ঘটেনি। ডেইজীকে অনুসরণ করে তাঁর বোন শামীম আর লুসিও দৈনিক আজাদীতে সাংবাদিকতায় যোগ দেয় এবং এখনো সেখানে কর্মরত আছেন। কবি ইউসুফ মুহম্মদের পতœী ইয়াসমিনও লুসির সঙ্গে আজাদীতে সাংবাদিকতা করছেন।
আজাদী সম্পাদক এম এ মালেকের কন্যা সনজিদা মালেক ‘নারী’ ও ‘খোলা হাওয়া’ নামে দুটি ফিচার পাতা সম্পাদনা করেন। তাঁকে সহায়তা করেন সাংবাদিক আসমা বীথি। বীথি অনেক দিন থেকে সাংবাদিকতায় আছেন। সময় টিভিতে হাজেরা শিউলি নামে একজন রিপোর্টার ছিলেন। তিনি খুব ভালো কাজ করছেন। তাঁকে ঢাকা অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দীপ্ত টিভির ব্যুরো চিফ একজন নারী-এটা আমাদের গৌরবের কথা। তাঁর নাম লতিফা আনসারী রুনা। ১৬ বছরের সাংবাদিকতা জীবন তাঁর। সুপ্রভাতে সাংবাদিকতা শুরু করে ‘যমুনা’ ও ‘মাছরাঙা’ টিভি হয়ে ‘দীপ্ত’ টিভিতে এসেছেন। তিনি এবার টিভি জার্নালিস্টস এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন।
সুপ্রভাতে বর্তমানে সহ-সম্পাদক পদে একজন নারী আছেন; তাঁর নাম তৃষ্ণিকা তালুকদার।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের চারজন ছাত্রী যারা ¯œাতকোত্তর পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করেছিলো, তারা সাংবাকিতায় এসেও শেষ পর্যন্ত স্থিত হয়নি। তারা প্রথমে সুপ্রভাত-এ জয়েন করে; পরে নুরুল ইসলাম সাহেবের ইংরেজি দৈনিক পিপলস ভিউ ইত্তেফাত-খ্যাত বিশিষ্ট সাংবাদিক ওসমান গণি মনসুর নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নিলে উক্ত চার নারী সাংবাদিক পত্রিকাটিতে যোগদান করে। কিন্তু সেখানে তারা বেশিদিন ছিলো না। চার সাংবাদিকের নাম বলা হয়নি, তাঁরা হচ্ছেন-হোসনে আরা, ফারজানা, সুবর্ণা মজমুদার, মোহছেনা আখতার ঝর্ণা। সুবর্ণা বর্তমানে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক, ঝর্ণা ব্যাংকার, ফারজানা সম্ভবত বিদেশে চলে গেছেন। হোসনে আরা স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় বসবাস করেন।
সাংবাদিকতায় নারীর আগমন ঘটলেও ছবিটা কিন্তু এখনো উজ্জ্বল নয়। দুই নারী যে নতুন পথে যাত্রা করেছিলেন, সে পথে তাদের অনুগমনের চিত্রটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। তেত্রিশ বছর পর যে চিত্রটা আমরা পাচ্ছি, তাতে দেখা যাচ্ছে, মাত্র দশ বারোজন নারী সাংবাদিকতা পেশায় এগিয়ে এসেছেন, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার জোয়ার না আসলে সংখ্যাটা হয়তো ডেইজী, লুসি, ইয়ামিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। এক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যাটা প্রায় পাঁচশো। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রসারের ফলে ঢাকায় অবশ্য প্রচুর নারীর মুখ দেখা যাচ্ছে সাংবাদিকতায়। চট্টগ্রামে প্রায় শূন্য প্রবৃদ্ধি হওয়ার কারণ কি তা’ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আমার মনে হয় একটা কারণ এই হতে পারে যে, চাকরিতে নিরাপত্তার অভাব। দ্বিতীয়ত পদোন্নতির শ্লথগতি, সীমাবদ্ধতা, সর্বোপরি অনিশ্চয়তা। তৃতীয়ত অনাকর্ষণীয় বেতন। কারণ যা-ই কো না কেন, নারীরা সাংবাদিকতায় আকৃষ্ট হচ্ছে না। যেমন তাঁরা শিক্ষকতা, ব্যাংকিং, আইন ও বিচার বিভাগ এবং সরকারী চাকরির পেছনে ছুটছেন। ব্যাংক ও শিক্ষকতায় নারীর সংখ্যা গুণে শেষ করা যাবে না।
এমন সময় ছিলো যখন ওকালতি, শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতাকে মহৎ পেশা হিসেবে গণ্য করা হতো। ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাটের দশকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাই সাংবাদিকতা পেশা অবলম্বন করতেন। অবশ্য নেশার ঝোঁকেও কেউ কেউ সাংবাদিকতা পেশায় ঢুকে পড়তেন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কাছে দল ও আদর্শের প্রচারই ছিলো মুখ্য, জীবিকা নির্বাহের প্রশ্ন ছিলো গৌণ। বিভাগ-পূর্ব কালে কমিউনিস্ট, বিপ্লবী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গ্রেফতার এড়াতে পুলিশের চোখে ধূলো দেয়ার জন্য সাংবাদিকতার ছত্রছায়া (ঈড়াবৎ) গ্রহণ করতেন। বিভাগ-উত্তর কালেও কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীরা হুলিয়া মাথায় সংবাদপত্র অফিসে আশ্রয় নিতেন।
ওকালতি ও শিক্ষকতা আদি পেশা। উকিল-ব্যারিস্টারদের নাম-ডাক, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সামাজিক মর্যাদা ছিলো। শিক্ষকদের মর্যাদা ছিলো, মানুষ অন্তর থেকে শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করতেন। অনেকের মান্যতাও ছিলো। কিন্তু শিক্ষকরা ছিলেন দরিদ্র।
তো ওকালতি, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতার সেই স্বর্ণযুগ কখন হারিয়ে গেছে আমরা কেউ তা’ খেয়াল করিনি।
বিলম্বে জানতে পারলাম আরো চার নারী টিভি চ্যানেলে সাংবাদিকতায় নিয়োজিত আছেন। তাঁরা হচ্ছেন নাসরিন জাহান সুলতানা-ইন্ডেপেন্ডেন্ট টিভিতে র্কস্পনডেন্ট পদে কাজ করছেন। ইতিপূর্বে বৈশাখী টিভিতে ছিলেন। সাংবাদিকতায় আছেন সাত বছর।
একুশে টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার শিউলি শবনমের ন’ বছর কেটে গেল সাংবাদিকতায়; আগে বৈশাখীতে ছিলেন। তারও আগে প্রিন্ট মিডিয়া কালের কণ্ঠ ও প্রথম আলোতে (প্রদায়ক ছিলেন)।
বাংলাভিশনের স্টাফ রিপোর্টার শাহেদা পিয়া ৬ বছর ধরে সাংবাদিকতায় আছেন। বর্তমান কর্মস্থলে পাঁচবছর। এর পূর্বে ইন্ডেপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে ছিলেন এক বছর।
শারমিন রিমা টিভি চ্যানেলে (এশিয়ান টিভি) সাংবাদিকতা শুরু করে বর্তমানে চট্টগ্রাম প্রতিদিনে স্টাফ রিপোর্টার পদে কর্মরত।
সাংবাদিকতা পেশায় অবশ্য এখন নবজীবনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বুম করায় টিভি সাংবাদিকতার প্রতি তরুণ-তরুণীরা ঝুঁকে আসছে। কথাটা ঢাকার বেলায় প্রযোজ্য। তাছাড়া অনেকগুলি নতুন পত্রিকাও বেরিয়ে গেছে। সাংবাদিকদের বেতন-ভাতাও পর্যাপ্ত পরিমাণে বেড়েছে। মর্যাদা বেড়েছে কিনা আমি বলতে পারবো না। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার এটাই সময়। সুযোগটা নারীরাও নিতে পারেন।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

জাপানি মায়ের কাছে থাকলে শিশুদের মঙ্গল: আদালত

দুই মেয়েকে জিম্মায় পেতে আইনি লড়াই করছেন বাবা-মা। কখনো কখনো তাদের সঙ্গে মেয়েরাও আদালতের বারান্দায় ছুটেছে। শেষপর্যন্ত মায়ের কাছেই থাকছে এই দুই শিশু। রোববার (২৯

বিস্তারিত »

গুণিন : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

বহুকাল আগে কলকাতার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় একটি ফিচার নিবন্ধ পড়েছিলাম। তাতে টাটা কোম্পানির এক সময়কার বিখ্যাত জেনারেল ম্যানেজার রুশি মোদি সম্পর্কে আলোচনা ছিলো।

বিস্তারিত »

রাজনীতির চারকন্যা : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার আওয়ামী লীগের তিন বড় নেতার তিন কন্যা তাঁদের গুণী পিতৃদেবের উত্তরাধিকার বহন করার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় তাদের স্কন্ধোপরি তুলে নিয়েছেন। জৈবিক উত্তরাধিকার নয়,

বিস্তারিত »