রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১২ ফাল্গুন, ১৪৩০, ১৪ শাবান, ১৪৪৫

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

ওই মহামানব আসে

আমাদের অপরিমেয় শোক, দুঃখ, রোদনভরা বেদনাঘন একটি দিন পনের আগস্ট। এদিন হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারিয়ে বেদনায় নীল হয়ে গিয়েছিলো জাতি। পনের আগস্ট বাঙালির ভালে অপরিসীম লজ্জা, গ্লানি ও অনপনেয় কলংক লেপন করে দিয়েছে। সেই কলংক কখনো মুছবে না, ঘুচবে না।
হাজার বছরের মধ্যে এমনি প্রতারক, প্রবঞ্চক, হন্তারক, বিশ্বাসঘাতক ও শঠতাপূর্ণ দিবস বাঙালি জাতির জীবনে আর কখনো আসেনি। কিছুটা হয়তো ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির আম্রকাননে অভিনীত বিয়োগান্তক নাটকে সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের সঙ্গে তুলনীয়। সিরাজদ্দৌলা যদিও বাঙালি ছিলেন না, তথাপি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সিরাজের প্রতিরোধের মধ্যে জাতীয় বীরত্ব ও শৌর্য বীর্যের উপাদান খুঁজে বাঙালি ছয়শো বছর ধরে সিরাজদ্দৌলা নাটক দেখতে দেখতে কত রাত্রিকে যে অশ্রুর সাগরে পরিণত করেছে তার ইয়ত্তা নেই।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্যই প্রাণ দিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পূর্বে একাধিকবার তাঁর জীবন সংশয় দেখা দিয়েছিলো। সেই স্বাধীন দেশ যখন প্রতিষ্ঠা করলেন, তখনো স্বাধীনতা বিপদমুক্ত হলো না। যে স্বাধীনতা এনেছিলো বাঙালি জাতি, তাকে রক্ষার জন্য সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে জাতিকে। বঙ্গবন্ধুকেই জীবন দিয়ে স্বাধীনতার দাম দিতে হয়েছে।
সিরাজদ্দৌলার বক্ষভেদী প্রবিষ্ট মোহাম্মদী বেগের ছুরির ফলার চেয়ে বঙ্গবন্ধুর শরীরে ঘাতকের বুলেটের আঘাত শতগুণ হয়ে বেজেছে প্রতিটি বাঙালির বুকে। তাদের হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে রক্ত, অশ্রুর বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছে বাংলার সবুজ শ্যামল প্রান্তর। সিরাজদ্দৌলা তাঁর মাতামহ আলীবর্দী খাঁর থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা নিয়ে নবাবির স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সপরিবার সপারিষদ প্রাণ দিয়েছেন। তিনি একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে কোন রাজ্য পাননি, তিনি নিজে একটি রাজ্য বানিয়েছেন। রাজ্য নয়, প্রজাতন্ত্র। তাই তিনি রাজা নন, তিনি প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। পরে প্রধানমন্ত্রী হলেন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য; সংবিধান প্রণয়ন করে গণতন্ত্রের পক্ষে জাতির যাত্রার শুভ সূচনা করেছিলেন, পরিস্থিতির প্রয়োজনে পরে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু বাঙালির সহস্র বর্ষের সাধনার ধন। কেন বঙ্গবন্ধু বিবিসির জরিপে হাজার বছরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির শিরোপা লাভ করেছেন ?
বঙ্গবন্ধু কেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি? হাজার বছরে কত বড় বড় মনীষী, রাজনৈতিক নেতা, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, জ্ঞানীগুণীরা বাঙালির জীবনকে আলোকিত ও আন্দোলিত করেছেন, সৃজ্যমান ইতিহাস ও সভ্যতাকে নির্মাণ করেছেন স্ব স্ব মেধা, উদ্ভাবন অনন্যসাধারণ সাধনা ও কর্মকৃতি দিয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মহামনীষী দীপংকর শ্রীজ্ঞান-অতীশ, শ্রীচৈতন্য, রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ, জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক, মানবেন্দ্রনাথ রায়, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, সত্যজিৎ রায়-এর নাম। তাঁরা প্রত্যেকে বাঙালি জাতির সভ্যতা বিনির্মাণে মূল্যবান অবদান রেখেছেন। কিন্তু তাঁরা কেউ বাঙালি জাতিকে সংগঠিত করেননি। কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেননি। সেখানেই বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব, অনন্যতা।
ইতিহাসে দেখা যায়, গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের কালে ষষ্ঠ শতাব্দির প্রথম ভাগে একটি স্বাধীন বঙ্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। গোপীচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব এই রাজ্যের রাজা ছিলেন। কিন্তু তারাও বাঙাল নন। দক্ষিণ এবং পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের কতকাংশ এই স্বাধীন বঙ্গরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ষষ্ঠ শতাব্দির শেষভাগে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের কতকাংশ নিয়ে গৌড়রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজা শশাঙ্ক ছিলেন এর প্রথম সার্বভৌম নৃপতি।
ত্রয়োদশ শতাব্দি থেকে ষোড়শ শতাব্দি পর্যন্ত দুশো বছরের (১২০৪-১৫৭৬) স্বাধীন সুলতানী আমল বাঙালির ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়। কিন্তু সুলতানরা বাঙালি ছিলেন না এবং সেই বাংলা এই বাংলা নয়।
এসব রাজতন্ত্রের কথা। বঙ্গবন্ধু জনগণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গোটা বাংলার ইতিহাসে এমনকি আরেকটি উদাহরণ পাই যখন রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর শতবর্ষব্যাপী অনৈক্য, আত্মকলহ ও বহিঃশত্রুর পুন: পুন: আক্রমণে বাংলার গণতন্ত্র ধ্বংস হয়েছিল। তখন দেশে কোন রাজা ছিলো না, প্রত্যেক ক্ষত্রিয়, সম্ভ্রান্ত লোক, ব্রাহ্মণ এবং বণিক নিজ নিজ এলাকা স্বাধীনভাবে শাসন করতেন। সংস্কৃতে ওই অরাজক পরিস্থিতিকে বলা হয় মাৎস্যন্যায়।
এই চরম দুঃখদুর্দশা হতে মুক্তিলাভের জন্য বাঙালি জাতি যে রাজনৈতিক বিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছিল, ইতিহাসে তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশের প্রবীণ নেতাগণ স্থির করলেন যে, পরস্পর বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে একজনকে রাজপদে নির্বাচিত করবেন এবং সকলেই স্বেচ্ছায় তাঁর প্রভুত্ব স্বীকার করবেন। দেশের জনসাধারণও সানন্দে এই মত গ্রহণ করল। এর ফলে গোপাল নাম এক ব্যক্তি বাংলাদেশের রাজপদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বাঙালির এই দেড়-দু’হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমাদেরকে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়, তা’হলো ১৯৭১ সালে যে স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি আগে কখনো তা সম্ভব ছিলো না। বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাঙালির স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন, বাঙালিকে প্রথম জাতি পরিচিতি প্রদান করলেন। বঙ্গবন্ধু নতুন করে ইতিহাস লিখলেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে একটা করে হিমালয়ের উচ্চতা এবং মহাকাব্যের বিশালতা ও গভীরতায় বাঙালির ইতিহাসে এটি একটি অনন্যসাধারণ ঘটনা। বঙ্গবন্ধু বাঙালির নতুন ইতিহাসের স্রষ্টা, মহানায়ক।
বঙ্গবন্ধুর পূর্ববর্তী এবং সমসাময়িক নেতাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর জীবনব্যাপী সংগ্রাম ও সাধনাকে নিবেদিত করেছেন। সমসাময়িক সমস্যা ও ইস্যু নিয়ে তিনি আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও পূর্ববঙ্গকে (পূর্ব পাকিস্তান) স্বাধীন করতে হবে এই কথাটিকে যৌবনের উন্মেষকালে একবার যখন সত্য বলে জেনেছেন, জীবনে আর কোনো দিন এক মুহূর্তের জন্য সেকথা বিস্মৃত হননি। সেজন্যই তিনি বঙ্গবন্ধু।
বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য ভারতীয় সাহায্য চাইতে অন্তত তিনবার (১৯৬১, ১৯৬২ সালে দু’বার এবং আরেকবার সম্ভবত আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর) আগরতলা গেছেন বঙ্গবন্ধু। সিলেটের মোয়াজ্জেম চৌধুরীরা নেতাজী সুভাষ বসুর স্টাইলে বঙ্গবন্ধুকে ভারতের মধ্য দিয়ে লন্ডন নিয়ে গিয়ে প্রবাসী সরকার গঠন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম চালাতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৬২ সালে সে সময় ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনে কর্মরত কূটনীতিক এস এস ব্যানার্জীর মাধ্যমেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর সাহায্য চেয়ে।
১৯৬১ সালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য পূর্ববঙ্গ মুক্তিফ্রন্ট একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমন তথ্য পাওয়া যায় শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের বইতে। তিনি জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু তাঁকে উক্ত সংস্থার নামে মুদ্রিত কিছু লিফলেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিলি করার জন্য দিয়েছিলেন। তিনি লিফলেটগুলি শেখ ফজলুল হক মণিকে দিলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের বিভিন্ন রুমের দরজার নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।
তারও আগে ১৯৬০ সালে দিল্লির সাউথ ব্লকে পাকিস্তান ডেস্কে কর্মরত একজন গোয়েন্দা চট্টগ্রামে এসেছিলেন। তিনি পতেঙ্গা সৈকত, হালিশহর ইত্যাদি এলাকা পরিদর্শন করে নোয়াখালী চলে গিয়েছিলেন। এটিও বঙ্গবন্ধুর একটি স্বাধীনতা প্রচেষ্টার অংশ। উক্ত গোয়েন্দার নাম রাজ নির্মল নারায়ণ চৌধুরী। তার বাড়ি নোয়াখালী। তিনি ‘র’ চিফ রামনাথ কাও’র সহকারী ছিলেন। তার সফরের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করা। বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এম এ আজিজ ও পরবর্তী কালে আগরতলা মামলার আসামি মানিক চৌধুরী উক্ত গোয়েন্দার সঙ্গে ছিলেন।
এসব ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু কত মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াস স্বাধীনতার জন্য আদি গোপন বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা নয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তারও আগে থেকে স্বাধীনতার জন্য গোপনে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। সেটা আমরা ইতিমধ্যে দেখিয়েছি। স্বাধীনতা চিন্তা ও স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র গোপন বৈপ্লবিক প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন সকলের চেয়ে এগিয়ে।
১৯৬১ সালের শেষার্ধ থেকে বেআইনি ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়। সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী এ ব্যাপারে দুই দলের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। আওয়ামী লীগ থেকে শেখ মুজিব ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং কমিউনিস্ট পার্টি থেকে মণি সিংহ ও খোকা রায় এসব গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব কর্মসূচিতে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবিকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি বৈঠকে বলেন: ওদের সাথে আমাদের আর থাকা চলবে না। তাই এখন থেকেই স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে; আন্দোলনের প্রোগ্রামে ঐ দাবি রাখতে হবে।
কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে সম্মত হননি। তাঁরা বলেছিলেন, “এই পরিস্থিতিতে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবি এখন একটি হঠকারী দাবী।”
বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও সংগ্রামকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়Ñএকটি স্থানিক ও সাময়িক, আর একটি স্থায়ী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাঁর রাজনীতির চিরস্থায়ী ও চিরসত্যকথা। এ কারণে পঞ্চাশের দশকে সাতচল্লিশে দেশভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে যখন রাজনীতি আরম্ভ করছেন, তখন বিরোধী নেতৃবৃন্দের মধ্যে ঢাকায় রাজধানীর নিয়ন্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অনেক পূর্ববর্তী নেতা শের-ই- বাংলা এ কে ফজলুল হক, তাঁর সাক্ষাৎ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, কমরেড মনি সিং প্রমুখ। বঙ্গবন্ধুর সমসাময়িক নেতা ছিলেন অলি আহাদ, খোন্দকার মুশতাক আহমদ, অধ্যাপক মোজফফর আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা প্রমুখ।
৭০ সালে এ কে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী ছাড়া অন্য সকল নেতাই ছিলেন জীবিত। কিন্তু তাঁরা কেউ জনপ্রিয়তায় বঙ্গবন্ধুর ধারে কাছেও ছিলেন না। জনপ্রিয়তায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব তখন এত উচ্চতায় উপনীত হয়েছিলো যে, শুধু হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্ঘ এভারেস্ট-এর সঙ্গে তাঁর তুলনা হতে পারতো। বঙ্গবন্ধুর তুলনায় অন্য নেতাদের মনে হচ্ছিলো বামন। এ কারণে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্থপতি, স্বাধীনতার মহানায়ক।
বঙ্গবন্ধুই বাঙালি জাতিসত্তা জাগ্রত করেন, জাতি হিসেবে বাঙালি জাতিকে সংগঠিত করেন। বাঙালির অভিন্ন ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ছিলো, কিন্তু যে ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে জাতিসত্তার স্ফূর্তি ঘটে, পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের ভৌগলিক সীমানায় বসবাসকারী বাঙালির জাতি হিসেবে সংগঠিত হবার অবকাশ মেলে। ১৯৬৬ সালে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্বোধন ঘটায়।
পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানের ‘বাংলাদেশ’ নামকরণও প্রথম বঙ্গবন্ধুই করেন। ১৯৬৯ সালে তিন নেতার মাজারে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ’ শব্দ ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশ নামে কোনো অখণ্ড রাষ্ট্র কখনো ছিলো না। বঙ্গ, গৌড়, রাঢ়, পুন্ড্র, বরেন্দ্র, সমতট, হরিকেল ইত্যাদি নানা স্বাধীন বিচ্ছিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিলো পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে বাংলা মুুলুক নামে পরিচিত ভূখণ্ডটি। ব্রিটিশ শাসনামলে বিচ্ছিন্ন জনপদ বা স্বাধীন রাজ্যসমূহকে একীভূত করে অখণ্ড বাংলার সৃষ্টি। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের চেষ্টা বাঙালির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে ভেস্তে যায়। ১৯৪৭-এ অখণ্ড বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে পূর্ববঙ্গকে পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাতচল্লিশের বাংলা ভাগের মূলে ছিলো জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের তাড়না। জিন্নাহ সাহেব বাঙালি জাতির প্রধান দুই উপাদান হিন্দু ও মুসলমানকে দুই জাতি হিসেবে বর্ণনা করে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও ধর্ম কখনো জাতীয়তার ভিত্তি হতে পারে না। তা সত্ত্বেও জিন্নাহ সাহেব হাজার মাইলের ব্যবধানে বসবাসকারী মানুষ, যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এমনকি গাত্রবর্ণও ভিন্ন ভিন্ন, শুধুমাত্র ধর্ম বিশ্বাসে ছিল অভিন্ন, তাদেরকে ধর্মের রুজ্জুতে গেঁথে একটি আজব রাষ্ট্র গঠন করলেন যাকে বলা হলো, পাকিস্তানি জাতীয়তা। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দেশটির জন্মের সাড়ে চার মাস পর বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করে পাকিস্তানি জাতীয়তাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন। ছাত্রলীগ গঠন ছিল একটি মেয়াদী বোমা, যা ৭১-এর ২৬ মার্চ বিস্ফোরিত হয়ে পাকিস্তানকে খানখান করে দিয়েছিলো।
যাই হোক, জিন্নাহ সাহেব পাকিস্তানে মুসলিম জাতীয়তাবাদ কায়েম করলেন। বঙ্গবন্ধু জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপরীতে একজাতিতত্ত্বের ধারণা উপস্থিত করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন। তিনি বললেন ধর্মের ভিত্তিতে কোন জাতি হতে পারে না। অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য জাতি গঠনের আবশ্যকীয় শর্ত। সাতচল্লিশে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে এই ভৌগোলিক সীমার মধ্যে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তার উপাদান দেখতে পেলেন এবং বাংলাদেশের যে ছবি তিনি মনে মনে কল্পনা করতেন, পূর্ববঙ্গের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে তার সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ করেন। অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে জাতীয়তা নির্মাণে সচেষ্ট হলেন। পূর্ববঙ্গকে (তখনও পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানের উপনিবেশের মত শোষণ এবং উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য ও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মত ব্যবহার দেখতে দেখতে অভিমানাহত বাঙালি জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে আরম্ভ করে। ষাটের দশকে বাঙালি জনমনে ধূমায়মান অসন্তোষের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেয়। ৬ দফার মধ্যে নিহিত স্বায়ত্বশাসনের দাবি বাঙালির মুক্তিসনদ হিসেবে প্রতিভাত হয়। ৬ দফা মানতে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির অস্বীকৃতি থেকে বাঙালি স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়।
অতঃপর ৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামী লীগকে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে বিজয়ী করে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রদান করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গণরায় মানতে অস্বীকার করে বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু বাংলদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে জাতিকে পাকিস্তানি হানাদারদের বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করার আহ্বান জানালে জাতি মুুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে ২৫ মার্চ রাতে তাঁর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গিয়ে আটকে রেখে তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিলো। বাংলাদেশে যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী হেরে যাওয়ায় পাক সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন।
সমস্ত আলোচনা থেকে একথা নিঃসংশেয়ে প্রমাণিত হয় যে, বঙ্গবন্ধুই বাঙালি জাতির জনক এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা।
পঁচাত্তরের খুনীরা ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছিলো বাংলাদেশকে, একটি গোলাপকে। কেননা বঙ্গবন্ধু একজন ব্যক্তি মাত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আদর্শের প্রতীক, একটি চেতনার নাম। সে আদর্শ বাংলাদেশ, সেই চেতনা বাঙালিত্ব।
তবে খুনীরা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধুর দেহান্ত হলেও তাঁর আদর্শ বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি বেঁচে আছে। বঙ্গবন্ধুর দৈহিক মৃত্যুর ৪৮ বছর পরও আজো বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নিত্য উপস্থিতি, বঙ্গবন্ধু আজো এদেশে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, বঙ্গবন্ধু ততদিন বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের মাঝে।
কারা ওরা? মুশতাক, চাষী, ঠাকুর, রশিদ, ফারুক-যাদেরকে আমরা খুনী বলে চিনি, ব্যক্তি পরিচয়ের আড়ালে আসলে কি ছিলো তারা? তারাও একটি আদর্শের প্রতীক, কিংবা তাদেরকে শিখণ্ডী হিসেবে খাড়া করে আড়ালে বসে যে অট্টহাসি হাসছিলো, ১৫ আগস্টের ভোর রাতে ক্লিন শেভ হয়ে সুটেড বুটেড হয়ে পূর্ণ সামরিক পোশাকে সজ্জিত হয়ে কিলিং মিশন অ্যাকমপ্লিশ্্ড হয়েছে শুধু এ খবরটা শোনার জন্য যে প্রস্তুত হয়ে উৎকর্ণ হয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় পায়চারি করছিলো, সে জিয়াউর রহমান। ক্ষমতারূঢ় হওয়ার অনেক পরে সে নিজেই জানান দিয়েছিলো, তার আদর্শ ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’, যা আসলে ইসলামি তথা পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদেরই নামান্তর। তার আগে মুশতাক বাংলাদেশের রাষ্ট্রাদর্শ বিসর্জন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, বাংলাদেশ বেতারকে ‘রেডিও বাংলাদেশ’-এ বদলে দেয়। বঙ্গবন্ধু নয়, বঙ্গবন্ধুর পোশাককেও ঘৃণা করতো মুশতাক, তাই সে কিম্ভুতকিমাকার নতুন এক জাতীয় পোশাকের প্রচলন করতে চেয়েছিলো। রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির মধ্যে তিনটি অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রকে একে একে পাল্টে দেয়া হলো। এই মূলনীতিগুলি মুক্তিযুদ্ধেরই অর্জন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িকতার পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং শ্রেণী বৈষম্য ও শোষণভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তে শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমতাভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা যা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার ছিলো, তাকেও বিসর্জন দেয়া হলো। এরপর যা থাকলো সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ নামের খোলসে ‘পাকিস্তান’।
মুশতাক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করলো, জিয়া তাকে জায়েজ করলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মোড়কে। আসলে মুশতাক, চাষী ছিলেন ৭১-এ পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর প্রেতাত্মা। মুশতাক, চাষী মুক্তিযুদ্ধেই পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারশেনের প্রস্তাব নিয়ে কম দেন-দরবার করেননি। জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং কামরুজ্জামানের সতর্কতা ও দৃঢ়তায় তখন মুশতাক সফল হতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে মুশতাক ক্ষমতায় আরোহনের তার বহুদিনের সাধ পূরণ করলো। পর্দার অন্তরালে থেকে যিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে মদদ যুগিয়েছেন তিনি হচ্ছেন জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু তাঁকে সেনা প্রধান করেননি, এই রাগ থেকে জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের চক্রান্তে সামিল হন।
মুক্তিযুদ্ধ থেকেই জিয়া এক রহস্যময় চরিত্র। জিয়া দায়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং প্রথম দিকে তিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হরিণা ক্যাম্পে ১ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। কিন্তু তার সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করে তাকে ১ নং সেক্টর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে তিনি অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন বলে সন্দেহ করা হয়। তিনি ওসমানী সাহেবের প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োগের বিরোধিতা করেন এবং তাঁকে প্রধান সেনাপতি পদ থেকে সরানোর চেষ্টা করেছিলেন। খালেদ মোশারফের বিরোধিতার জন্য পারেননি। কামালপুর যুদ্ধে জিয়ার ভুলের কারণে বাংলাদেশ বাহিনীর অনেক অফিসার ও জওয়ান হতাহত হন। সেজন্য জেনারেল ওসমানী তাকে স্যাক করতে চেয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার সবচেয়ে বড় বেনিফিসিয়ারি হচ্ছেন জিয়া। তিনি ক্রমান্বয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সেনা প্রধান এবং অবশেষে প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী, আলিম ও মতিনকে মন্ত্রী করার মাধ্যমে একে একে স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসিত করেন। দালাল আইন বাতিল করে ঘাতক দালাল, রাজাকার, আলবদরদের ছেড়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জন বর্জন করেন, রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তর থেকে মুুক্তিযুদ্ধের চেতনা নস্যাৎ করে দেন।
মুশতাক ও জিয়া বঙ্গবন্ধুর নামোচ্চারণ ও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে চেয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে দিতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দৈহিক মৃত্যু ঘটলেও মানুষ যাঁকে হৃদয়ে ধারণ করেছে, অত সহজে কী তাঁকে মুছে ফেলা যায়। মানুষের চেতনায় ঠাঁই নিয়ে তিনি বেঁচে আছেন চিরকাল। মৃত বঙ্গবন্ধু জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি শক্তিশালী বলে প্রমাণিত হলেন। বঙ্গবন্ধুর নামের সঙ্গে বাংলাদেশ এমন ছাপমারা যে, বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। বাংলার আকাশ, বাতাস, নদী, হাওর-বাওর, বিল, মাঠ-ঘাট, গাছ, লতাপাতা, ফুল-পাখি, প্রকৃতির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু মিশে আছেন নিবিড়ভাবে। তাঁকে আলাদা করে খুঁজে নিতে হয় না।
ফলে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যারা ভেবেছিলো, একাত্তরে পরাজিত ও পরিত্যক্ত পাকিস্তানকে আবার তারা ফিরিয়ে এনেছেন বাংলাদেশে, তারা বোকার স্বর্গেই বাস করছিলেন। তাদেরকে যিনি বধ করবেন তিনি গোকুলে বেড়ে উঠছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর আত্মজা শেখ হাসিনা; বিদেশে থাকার কারণে ৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঘাতকদের বুলেট থেকে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যার প্রথমজন, কনিষ্ঠ শেখ রেহানা। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ এবং বেপথু হয়ে যাওয়া পিতার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশকে আবার স্বস্থানে স্বপথে ফিরিয়ে আনার বজ্রশপথ নিয়ে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা ফিরে আসলেন স্বদেশে। প্রথমে পিতার গড়া দল, স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের হাল ধরলেন। হতাশ, মনোবলহারা, ছিন্নভিন্ন দলীয় নেতা কর্মীদের সুসংগঠিত করে আওয়ামী লীগে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেন। পুনর্গঠিত দলতে নিয়ে তিনি ৯৬ তে এবং ২০০৮ থেক বর্তমান সময় পর্যন্ত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশ শাসনের অধিকারী হয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরিয়ে এনেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার নীতি গ্রহণ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার আসনে বঙ্গবন্ধুকে প্রতিষ্ঠিত করলেন; তাঁকে ‘জাতির পিতা’ ঘোষণা করলেন, সাংবিধানিকভাবেও তিনি তাই। বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের দিনকে জাতীয় শোক দিবস, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে জাতীয় শিশু-কিশোর দিবস ঘোষণা, ‘জয় বাংলা’-কে জাতীয় স্লোগান, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করা; বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেল হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করে স্বাধীনতার চেতনার ভিত্তির ওপর বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। বাংলাদেশকে সোনার বাংলাদেশে পরিণত করার জন্য বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত করেন। ২০৪১ সালে উন্নত দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এখন কাজ করে যাচ্ছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার ব্রত গ্রহণ করেছেন। করোনা অতিমারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল ও উন্নতির পথে পরিচালিত করতে পারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও বলিষ্ঠতার স্বাক্ষর বহন করে। পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থ যোগান দিতে বিশ্ব ব্যাংক অস্বীকৃত হওয়ার পর নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। ঢাকায় মেট্রোরেল এবং চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ শেখ হাসিনার সরকারের অমর কীর্তি।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

কক্সবাজার রেললাইন, বঙ্গবন্ধু টানেল, পদ্মা সেতু অনেক প্রধানমন্ত্রীর কাজ এক প্রধানমন্ত্রী করে ফেলছেন :

কেউ কি ভেবেছিলো কক্সবাজারে ট্রেন যাবে ? কেউ কি ভেবেছিলো কর্ণফুলী নদীর তলদেশে সুড়ঙ্গ হবে এবং সেই সুড়ঙ্গ পথই কর্ণফুলীর পানি পাড়ি দিয়ে এপার ওপার

বিস্তারিত »

আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযোদ্ধা এজাহার মিয়া প্রথম বঙ্গবন্ধুর কবর জেয়ারত করেন

পঁচাত্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সকল সদস্য এবং নিকট আত্মীয়স্বজনকে পৈশাচিক উপায়ে হত্যা করার পর দেশে চরম ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ

বিস্তারিত »

বঙ্গবন্ধুর কবর প্রথম জেয়ারত করেন মুক্তিযোদ্ধা এজাহার মিয়া

পঁচাত্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সকল সদস্য এবং নিকট আত্মীয়স্বজনকে পৈশাচিক উপায়ে হত্যা করার পর দেশে চরম ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ

বিস্তারিত »

কক্সবাজার রেললাইন হলো, বাদলের স্বপ্নের তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু হল না

সব সাংসদ সংসদ বেত্তা বা পার্লামেন্টারিয়ান হন না, কেউ কেউ হন। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং বর্তমান বাংলাদেশ আমলে যেসব সংসদ গঠিত হয়েছে, তা’ থেকে

বিস্তারিত »

জাতীয় রাজনীতি, সংসদ নির্বাচন ও চট্টগ্রামের ছাত্ররাজনীতির নায়করা

সাতচল্লিশের চৌদ্দই আগস্ট পাকিস্তান ভূমিষ্ঠ হবার পর পূর্ববঙ্গে কোন বিরোধী দলের অস্তিত্ব ছিলো না। কমিউনিস্ট পার্টি বিরোধী দলের ভূমিকা নিতে পারতো, কিন্তু ভ্রান্ত নীতির কারণে

বিস্তারিত »

নোয়াজিশপুরে আবদুল হক চৌধুরী স্মৃতিকেন্দ্র চট্টগ্রামবাসীর তীর্থস্থান

প্রখ্যাত গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর গবেষণা ইতিহাস চর্চায় একটি নতুন ধারা সংযোজন করেছে। কিন্তু তিনি শুধু চট্টগ্রাম নয়, আরাকান এবং সিলেটকেও তাঁর গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করে

বিস্তারিত »

হেলাল উদ্দিন চৌধুরী : একজন সৎ সাহসী ও দক্ষ সাংবাদিকের প্রস্থান

চট্টগ্রামের সাংবাদিক ভুবন থেকে একজন ভালো সাংবাদিক সম্প্রতি হারিয়ে গেলেন। আশির দশকে তিনি কক্সবাজার থেকে এসে দৈনিক আজাদীর রিপোর্টিং বিভাগে যোগদানের মাধ্যমে চট্টগ্রামে তাঁর সাংবাদিক

বিস্তারিত »

মক্কা বিজয়ের পূর্বাপর মুসলমান ও আওয়ামী লীগের হেমন্ত-বসন্ত আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই লেখা লিখতে লিখতে আমার চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কলামিস্ট, কবি, তার্কিক ইদরিস আলমের কথা

বিস্তারিত »

আওয়ামী লীগের জন্ম

আওয়ামী লীগ অজেয়, অবিনাশী দল। ১৯৪৯ সালে জন্মের পর থেকে এই দল ক্ষমতার ভেতরের এবং এমনকি বাইরেরও অনেক শক্তির চক্ষুশূল হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগকে ধ্বংস

বিস্তারিত »