রবিবার, ২১ জুলাই, ২০২৪, ৬ শ্রাবণ, ১৪৩১, ১৪ মহর্‌রম, ১৪৪৬

একাত্তরে চট্টগ্রাম শহরের দুর্ধর্ষ গেরিলা অমল মিত্র

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শহর রণাঙ্গণে যেসব সাহসী মুক্তিযোদ্ধা তাঁদের দুঃসাহসী গেরিলা অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখতেন, তাঁদের মধ্যে অমল অমল মিত্র নামটি তাঁর বেপরোয়া স্বভাব, ব্যক্তিগত বীরত্ব ও শৌর্যবীর্যের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশিষ্টতার দাবিদার। আইস ফ্যাক্টরি রোডে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে অমল, রফিক, ফজলু, শফিউল বশরের খ-যুদ্ধ, আগ্রাবাদ ছোটপুল থেকে অমলের রিভলভার তাক করে পলায়নপর একজন পাকিস্তানি সৈন্যের পিছু ধাওয়া করে আগ্রাবাদ সিডিএ-তে পৌঁছে তাকে হত্যা ইত্যাদি ঘটনায় অমল মিত্রের বীরত্ব মানুষের মুখে মুখে ফেরে। অমত্র মিত্র আরবান গেরিলা ওয়ালফেয়ারে বিশেষ দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। জার্মানির বাদের মেইনহফ শহুরে গেরিলা গোষ্ঠীর অনেক দুর্ধর্ষ অপারেশনের কথা আমরা বই-পুস্তকে পড়েছি। ঢাকার ক্র্যাক প্লাটুনের এবং চট্টগ্রামে অমল, রফিক, ফজলু বশর, জিন্নাহ, রইসুল হক বাহার-রা; তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহুরে গেরিলা যুদ্ধের উৎকৃষ্ট নমুনা প্রদর্শন করেছিলেন। বাদের-মেইনহফ গেরিলারা তহবিল সংগ্রহের জন্য ব্যাংক ডাকাতি, মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও জার্মান পুলিশ স্টেশনে বোমা হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন পশ্চিম জার্মানিতে। বাংলাদেশেও ঢাকায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং মোনায়েম খানের বাসভবনে হামলা চালানোর পর বিশ্বব্যাপী এদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ছড়িয়ে পড়েছিলো।
আগ্রাবাদ হোটেল অপারেশন, আমেরিকান এক্সপ্রেস ডাকাতি, আগ্রাবাদ ফায়ার ব্রিগেড অপারেশন, শহরময় একযোগে বিস্ফোরণ ইত্যাদি ঘটনা চট্টগ্রাম শহরের গেরিলা যুদ্ধকে মহিমান্বিত করে রেখেছে। আগ্রাবাদ হোটেলে বিশ্বব্যাংকের টিম আসার খবর পেয়ে হোটেলের পাশে একটি ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিলো। ডা. মাহফুজের কমান্ডের অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন ডা. সাইফুদ্দিন, ফয়েজুর রহমান, জাফর উল্লাহ বোরহান, গবীবুুল্লাহ মাতবর।
২৯/৩০ মার্চ থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বগাফা বিএসএফ বগাফা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হলে অমল প্রথম ব্যাচে সেখানে গেরিলা যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। যুদ্ধ এলাকা হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম শহরকে। কারণ চট্টগ্রাম শহরের নালাপাড়ায় তাঁর জন্ম এবং সেখানেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। শহরের রাস্তাঘাট, গলি ঘুপচি তখনই তাঁর চেনাজানা হয়ে যায়। সেই শহরেই তিনি শত্রু হননের অভিযানে এসেছিলেন একাত্তরে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অমল মিত্র ১৯৫২ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রাম শহরের সরদঘাটে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী মোক্ষদা রঞ্জন মিত্র এবং মা পুষ্প রাণী মিত্র। মাত্র ৬ বৎসর বয়সে তিনি তাঁর বাবাকে হারান। ছয় ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি ৪র্থ। ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেয়া সত্ত্বেও ভোগবিলাসে নিজেকে জড়িয়ে না রেখে তিনি খুব অল্প বয়স থেকে দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে যুক্ত করেন। দুরন্ত অমল মিত্র ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলেন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ এবং গণমানুষের সেবায়, স্কুলজীবন থেকেই আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬৭ সালে স্কুলজীবনেই ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৮/৬৯ সালের গণআন্দোলনে সার্বক্ষণিক সংগ্রামে যুক্ত থাকেন। সে সময় তিনি আলকরণ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন উত্তপ্ত রাজনীতির সংগ্রামী মুখ অমল মিত্র পোস্টারিং, মিছিল-মিটিং-এ সার্বক্ষণিক সক্রিয় ছিলেন। ঐ সময়ে তাঁর সক্রিয় কর্মকা-ের ফলে তিনি তৎকালীন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি জহুর আহমেদ চৌধুরীর সুনজরে আসেন এবং তাঁর হাত ধরে অমল মিত্রের রাজনীতি ও আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। তিনি এ সময় কেন্দ্রীয় বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ৩০ মার্চ পর্যন্ত অমল শহরে ছিলেন। ৩১ মার্চ অমল রামগড়ের উদ্দেশে রওনা হন। রামগড় থেকে ত্রিপুরার বগাফা ট্রেনিং সেন্টারে ভারতীয় মেজর মি. বার্মার নেতৃত্বে ৭ দিনের স্বল্প প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
কিছুদিন পর অমল মিত্র এবং অন্যান্যরা আগরতলা হয়ে আসামের হাফলং-এ যান ট্রেনিং এর উদ্দেশে। প্রায় দেড় মাসের এ ট্রেনিং-এ তারা বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার এবং গেরিলা যুদ্ধের এ উপর প্রশিক্ষণ অর্জন করেন।
ট্রেনিং শেষে আগরতলা ফিরে এসে ট্রানজিট ক্যাম্পে অবস্থান নেন। ক্যাম্পে বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সাথে দেখা করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য দেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। ১০জন নিয়ে তাদের গ্রুপ গঠন করা হয়।
অমল ও তাঁর সহযোদ্ধারা (ডা. মাহবুব গ্রুপ, ডা. জাফরুল্লাহ, আনোয়ারুল ইকবাল, কামরুল ইসলাম, মুকুল দাশ, শফিউল বশর) মনু বাজার বর্ডার দিয়ে ঢুকে মিয়াজান ঘাট হয়ে দেশে প্রবেশ করেন। তারা সীতাকু-ে অস্ত্র রেখে বাসে করে চট্টগ্রাম শহরের পানওয়ালাপাড়ার একটি বাড়িতে ওঠেন। পরে তৎকালীন ওয়াপদার নির্বাহী প্রকৌশলী আলতাফ সাহেবের পিক-আপে করে ওপরে তরকারি রেখে নিচে অস্ত্র লুকিয়ে শহরে শেল্টারে নিয়ে আসেন। পরদিন আর একটি সেল্টারে মৌলভী সৈয়দের সাথে দেখা করতে যান অমল। মৌলভী সৈয়দ ছাত্রলীগ করার সময় তাঁর নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অন্যদের মতো ভারতে না গিয়ে শহরে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করা শুরু করেন। তিনিই তখন চট্টগ্রাম শহরে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
মৌলভী সৈয়দের সাথে অমল বিভিন্ন অপারেশনের পরিকল্পনা করেন। গেরিলা অপারেশনের প্রথম দিকে পাকিস্তানিদের দোসর আলবদর, রাজাকার এবং মুসলিম লীগের স্বাধীনতাবিরোধী নেতা যাদের বারংবার সতর্ক করা সত্ত্বেও সংশোধন হয়নি, তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে অমল মিত্র কর্তৃক মৃত্যু শাস্তি— দেওয়ার পর অন্যরা এসে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করে।
ইঞ্জিনিয়ার হারুনের নেতৃত্বে আমেরিকান এক্সপ্রেসের টাকা লুট করে অমল মিত্র এবং তাঁর সঙ্গীরা ২টি ট্যাক্সি ক্রয় করেন। ট্যাক্সিগুলোর ড্রাইভার ছিলেন দুইজন মুক্তিযোদ্ধা। ট্যাক্সি দুটো নিয়ে তারা অনেক সফল গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করেন।
আইস ফ্যাক্টরি রোডের রক্তক্ষয়ী অপারেশন
মুুক্তিযোদ্ধা অমল মিত্রের জীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কষ্টের অপারেশন ছিল আইস ফ্যাক্টরি রোড অপারেশন। যে অপারেশনে অমল মিত্র, রফিক, শফিউল বশর, ফজলুল হক মিয়া, তাদের গাড়ি উভয় দিক থেকে পাকিস্তানি হানাদার কর্তৃক আক্রান্ত হন। এই যুদ্ধে অমল মিত্রের অন্যতম সঙ্গী যোদ্ধা রফিক শহীদ হন। শফিউল বশর ৫টা গুলি খেয়ে গ্রেফতার হন এবং ফজলুল হক ভূঁইয়ার কোমরে গুলি লাগে।
আসলে সেদিন আইস ফ্যাক্টরি রোডে তাদের অপারেশনের কোনো পরিকল্পনা ছিলো না। তাদের টার্গেট ছিলো কাস্টমস কর্মচারীদের টাকা বহনকারী একটি ভ্যান। কিন্তু সেটি না পেয়ে তাৎক্ষণিক যে অপারেশন করতে যান, তা চট্টগ্রাম শহরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একই সাথে গৌরবময় বীরত্বপূর্ণ এবং বিয়োগাত্মক অধ্যায় সংযোজন করেছে এই দুঃসাহসী রক্তক্ষয়ী অভিযানে তাঁর একজন সহযোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন, তিনজন গুলিবিদ্ধ এবং একজন গুলিতে আহত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। শুধু অমলই সেদিন অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান। এবার গোড়া থেকে অপারেশনটার কথা বলা যাক।
অক্টোবরের শেষদিকে এই অপারেশনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। শহরের মুক্তিযোদ্ধাদের তখন টাকা পয়সার ভীষণ সংকট। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে প্রচুর মুক্তিযোদ্ধা এসে গেছে, স্থানীয়ভাবে সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়। এই বিশাল শহুরে গেরিলাদের থাকা, খাওয়া এবং আরো নানা প্রয়োজন মেটাতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। শহরের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব যাদের হাতে, এরা চিন্তায় পড়ে গেলেন। এ ব্যাপারে কোনো কুল কিনারা করতে না পেরে তারা অবশেষে সরকারি টাকা লুটের পরিকল্পনা করলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সিটি হাই কমান্ড অনেকদিন গোয়েন্দা লাগিয়ে পর্যবেক্ষণ করে জানতে পেরেছিলেন যে, কাস্টমস কর্মচারীদের মাসিক বেতনের টাকা স্টেট ব্যাংক থেকে একটি ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং এই তথ্যটা মিথ্যা ছিলো না। তারা হিসেব করে দেখলেন অক্টোবর মাস শেষ হয়েছে, এ মাসের বেতন নভেম্বরের পয়লা তারিখ নেয়া হবে।
মৌলভী সৈয়দ, ডা. মাহবুবুল আলম, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ আল হারুন, ডা. জাফরুল্লাহ, মোহাম্মদ হারিস, নুরুল ইসলাম, জালালউদ্দিন, আবু সাইদ সরদার প্রমুখ। শীর্ষ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সংগঠকবৃন্দ সিদ্ধান্ত নিলেন ১ নভেম্বর স্টেট ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যে ভ্যানটি বের হবে, সেটি লুট করা হবে। অপারেশনের সার্বিক দায়িত্ব দেয়া হয় ডা. মাহবুবকে। অপারেশনের জন্য অমলসহ ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়। দলনেতা নির্বাচিত হন ডা. জাফরুল্লাহ; দলের সদস্যরা হচ্ছেন সৈয়দ রফিক (তিনি কমার্স কলেজের ছাত্র ছিলেন, বাড়ি বোয়ালখালী), শফিউল বশর, ফজলুল হক ভূঁইয়া, ভোলানাথ ও অমল।
১ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯ টায় নুরুল ইসলামের পৈতৃক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগ্রাবাদ ওসমান কোর্ট থেকে একটি ফিয়াট (১১০০) কার নিয়ে রওনা হন মুক্তিযোদ্ধারা। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আরো কয়েকজন বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। তাদের সাথে ২টি এসএমজি, ৪টি ৩৮ রিভলভার, ২টি গ্রেনেড। কোতোয়ালীর নিউমার্কেটের মোড় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ইনফরমার ছিলো। কথা ছিলো ব্যাংকের সামনে ছদ্মবেশে অপেক্ষমান ইনফরমার গাড়ি রওনা হলে ইশারা করবে, তারা গাড়ির পিছু নেবেন এবং নিরাপদ স্থানে গাড়ি থামিয়ে টাকাগুলি নিয়ে ওদের গাড়ির চাবি নিয়ে শেল্টারে চলে যাবেন। তারা ২০ মিনিট অপেক্ষা করলেন ব্যাংকের সামনে, সময় শেষ হয়ে গেলো। কিন্তু সেদিন আর টাকা নিয়ে ভ্যান বের হলো না; ইনফরমার তাদেরকে চলে যেতে ইঙ্গিত দিলেন। বিফলমনোরথ হয়ে তারা কোতোয়ালী ঘুরে নিউমার্কেটের মোড় পার হয়ে সদরঘাট কালীবাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। ডা. জাফরুল্লাহ কোতোয়ালীর মোড়ে নেমে গেলেন। তখন অমলদের সবার মনে একটা হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছিলো। কারণ অপারেশনে এসে অপারেশন করতে পারলেন না। মনে হচ্ছিলো আত্মহত্যা করেন। বর্তমান নিউ মার্কেটের দক্ষিণে সদরঘাট রাস্তা যেখান থেকে পুরাতন নিউ মার্কেটের শুরু, সেখানে আইডিয়াল বুক স্টল নামে একটি বইয়ের দোকান ছিলো। আমাদের গাড়ি সেখানে আসতেই ঐ দোকানে খাকি পোশাক পরিহিত একজন অফিসার উর্দু ম্যাগাজিন পড়ছিলো তাদের মনে হলো। তারা খুশি হয়ে উঠলেন এই ভেবে যে, যাক তাহলে একটি টার্গেট পাওয়া গেল। সেখানে একটি মাংসের দোকানের পাশে গাড়িটা রেখে তারা ঐ অফিসারের সামনে গিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করেন। রফিক ও শফিউল বশর গুলি করে। এর মধ্যে গাড়ি ঘুরানোর পর একজন উলঙ্গ ফকির এসে তাদের সামনে চোখ বড় বড় করে তাকালো। তারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। তারপরও তো মুক্তিযুদ্ধ, তাই তারা অপারেশনে মনোযোগ দিলেন। অফিসারকে হত্যা করে তার রিভলভার নিয়ে আমার গাড়িতে উঠে রওনা দেন। গাড়ি সিটি কলেজের মোড় অতিক্রম করার সাথে সাথে পেছনের দিক থেকে পাকিস্তান আর্মির একটি গাড়ি এসে তাদের গাড়ির ওপর বৃষ্টির মতো গুলি চালাতে লাগলো। তারা গাড়ির চাকা ফাটিয়ে থামিয়ে দিলো। রফিক অমলের পাশে বসা ছিলো। হঠাৎ সে দরজা খুলে রাস্তায় লাফ দিয়ে পড়লো। তখনই তার শরীরের ওপর এক ঝাঁক বুলেট বিদ্ধ হলো, সে সঙ্গে সঙ্গে শহীদ হয়। শফিউল বশর লাফ দিয়ে গিয়ে পড়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উত্তর পাশের আবগারী অফিসে ঢুকে পড়লো। অমল আর ফজলু দেখলেন ওরা তাদের খুব কাছে চলে আসছে। অমল সেকেন্ডের মধ্যে ফজলুকে বললেন, সামনের দিক থেকে নেভির একটি গাড়ি আসছে। আপনি সামনে ফায়ার করেন, আমি পেছনে ফায়ার করছি, আর গ্রেনেড নিক্ষেপ করুন। মৃত্যু অবধারিত জেনে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গুলি শুরু করলেন, ফজলুও গ্রেনেড নিক্ষেপ করলো। তাদের ড্রাইভার ভোলানাথ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিরাপদ স্থানে সরে পড়লো। ফায়ার ও গ্রেনেড নিক্ষেপের সাথে সাথে সামনে এবং পেছন দিক থেকে পাক বাহিনীর দুটি গাড়ি পিছু হটে গেল।
এরই ফাঁকে অমল আর ফজলুল হক ভুঁইয়া গাড়ি থেকে দ্রুত লাফ দিয়ে পড়ে গড়ান দিয়ে নালায় পড়লেন। অমল পেছনের সিটে ছিলেন, তিনি ডান পাশের দরজা খুলে রাস্তায় নেমে দৌড়ে রেলওয়ে কলোনির মেম্বার ফরিদের বাসায় ঢুকে যান। কাউকে কিছু না বলে কাপড় চোপড় বদলে অমল একটি লুঙ্গি ও শার্ট গায়ে দিয়ে রিভলভারটি কোমরে গুঁজে ট্যাক্সি করে আগ্রাবাদের পানওয়ালাপাড়ায় সেল্টারে চলে যান। তখন পর্যন্ত তিনি জানতেন যে তিনি ছাড়া কেউ বেঁচে নেই। ঘটনার বিস্তারিত সন্ধ্যায় জানতে পারেন। রফিক শহীদ হয়েছে, শফিউল বশর পাঁচটা গুলি খেয়ে ধরা পড়েছে, ফজলুল হক ভুঁইয়া তার সাথে বাম পাশের দরজা খুলে পালিয়ে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হয়। গুলি খেয়েও সে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে সমর্থ হয়।
২ নভেম্বর দৈনিক আজাদীতে প্রধান শিরোনামে এই খবর প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিলো “সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সাথে পাক সেনাদের সবিরাম গুলি বিনিময়, একজন নিহত, তিনজন গ্রেফতার”।
এছাড়া বিভিন্ন চোরাগুপ্তা হামলা চলতে থাকে। অমল মিত্র এবং তাঁর সঙ্গীরা যুদ্ধ ছাড়া একটি দিন অতিবাহিত করলে অস্বস্তি বোধ করতেন। বিভিন্ন সময় রাস্তায় দাঁড়ানো পাকিস্তানি আর্মিদের টার্গেট করে তাদের ধরে নিয়ে তাদের অত্যাচারের শাস্তি দিতেন।
এছাড়াও দুঃসাহসী অমল মিত্র শহরব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা, পেট্রোল পাম্প অপারেশন এবং পাক হানাদারদের দোসর ও বেইমানদের হত্যায় অপারেশন পরিচালনা করেন। স্বাধীনতার উষালগ্নে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর আসে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তা, বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরেরা। তখন অমল মিত্র ও তাঁর সঙ্গীরা কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে সাহায্য করে।
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তৎকালীন সরকারের কোপ দৃষ্টি মুক্তিযোদ্ধা অমল মিত্রের উপর পড়ে। বারংবার তার বাড়িতে আর্মি অভিযান চালানো হয়। যার দুঃসহ ফল ভোগ করতে হয় তার পুরো পরিবারকে। এরপর অমল মিত্র ভারতে আত্মগোপনে চলে যান। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকেন এবং সুযোগ খুঁজতে থাকেন। কিছুদিনের মধ্যে সেই সুযোগ আসে। আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যাযের নেতৃত্ব এবং ভারত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছায়, বাংলাদেশ থেকে সামরিক সরকার উৎখাত সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পুরো বাংলাদেশ থেকে ১০ জনের একটি বাহিনী গঠন করা হয়। সেই বাহিনীর অন্যতম ছিলেন চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অমল মিত্র এবং নেতৃত্বে ছিলেন বরিশালের ক্যাপ্টেন মাহফুজুল আলম বেগ। এছাড়াও ছিলেন ফরিদপুরের সালাউদ্দিন, পটুয়াখালীর খান মোশারফ (বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান), গৌরনদীর সন্তোষ, ফারুক, মঈজুল ইসলাম, নড়াইলের শাহজাহানসহ আরো ২ জন। হিমালয়ের পাদদেশে সাহরানপুর এয়ারবেস থেকে আরো ৩ মাইল ভিতরে এই বাহিনী ৬ মাস তীব্র কঠিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ভারতের সামরিক বাহিনীর বিমানে করে তাদের আগরতলা নিয়ে আসা হয়। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে ভারতের রাজনীতির পটপরিবর্তন হয়। ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হন এবং মিশনের নেতৃত্বে থাকা ক্যাপ্টেন মাহফুজুল আলম বেগ, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের কাছে মিশনের তথ্য প্রকাশ করে দেন। ফলে সমস্ত মিশন ব্যর্থ হয়।
অমল মিত্র ও তার সঙ্গীরা তীব্র ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে আবার আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। ১৯৭৮ এর শেষের দিকে তিনি দেশে ফিরলেন। দেশে ফিরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন গ্রামে পলাশ নামে প্রায় ১০ মাস আত্মগোপন করেছিলেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম শহরে ফিরে চট্টলার সার্বজনীন শ্যামা পূজা উদ্যাপন পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পূজার পরদিনেই ১৯৭৯ সালে ২৪ অক্টোবর জিয়াউর রহমান সরকার কর্তৃক গ্রেফতার হন। গ্রেফতার হওয়ার পর তার উপর তীব্র নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ের শুভাকাক্সক্ষীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় জিয়া সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধা অমল মিত্রকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৮২ সালে তিনি মুনমুন মিত্রের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯৬ সালে খালেদা বিরোধী প্রচ- বিক্ষোভের সময় বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীকালে তীব্র আন্দোলনের মুখে তাকে খালেদা সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
অমল মিত্রের স্ত্রীর নাম মুনমুন মিত্র; তার দুই পুত্র, এক কন্যা। তাদের নাম : শান্তনু মিত্র- এমবিএ, জনতা ব্যাংকে কর্মরত। পূজা মিত্র- এমবিবিএস, চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ইন্টার্নি করছে। অনীক মিত্র- ইউআইটিএস-এ বিবিএ অধ্যয়নরত।
পাদটীকা : মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য অমল মিত্রের একটি খেতাব প্রাপ্য ছিলো। সশস্ত্র বাহিনী যদি বীরত্বের সব খেতাব নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে না নিতেন, তাহলে অনিয়মিত বাহিনীর (মুক্তিবাহিনী এবং মুজিব বাহিনী) সদস্যদের মধ্যে যাঁরা যুদ্ধে অসাধারণ শৌয-বীর্য প্রদর্শন করেছিলেন, তাঁরাও গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড পেতেন। যেমন চট্টগ্রাম শহর রণাঙ্গণের গেরিলা যোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ আল হারুন, অমল মিত্র, শহীদ সৈয়দ রফিক, জিন্নাহ এবং গ্রাম চট্টগ্রাম রণাঙ্গণের ক্যাপ্টেন করিম (উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের কিংবদন্তী গেরিলা কমান্ডার), সার্জেন্ট আলম, বাঁশখালীর সুলতান উল কবির চৌধুরী, টাঙ্গাইলের আবদুল বাতেন এবং কুষ্টিয়ার মারফত আলী প্রমুখ গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার হকদার ছিলেন। এই কথাটা সংসদে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সুন্দর করে বলেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিলো এরকমÑওসমানী সাহেব যাকে তাঁকে বীরত্বপূর্ণ খেতাব প্রদান করেছেন। গেরিলা যোদ্ধাদের মধ্যে শুধু ঢাকার ক্র্যাক প্লাটুনের কমান্ডার মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াকে বীরত্বপূর্ণ খেতাব পেয়েছেন দেখতে পাচ্ছি। কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম খেতাব পেয়েছেন, কিন্তু তিনি নিয়মিত বাহিনীর মতই যুদ্ধ করেছেন।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

কক্সবাজার রেললাইন, বঙ্গবন্ধু টানেল, পদ্মা সেতু অনেক প্রধানমন্ত্রীর কাজ এক প্রধানমন্ত্রী করে ফেলছেন :

কেউ কি ভেবেছিলো কক্সবাজারে ট্রেন যাবে ? কেউ কি ভেবেছিলো কর্ণফুলী নদীর তলদেশে সুড়ঙ্গ হবে এবং সেই সুড়ঙ্গ পথই কর্ণফুলীর পানি পাড়ি দিয়ে এপার ওপার

বিস্তারিত »

আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযোদ্ধা এজাহার মিয়া প্রথম বঙ্গবন্ধুর কবর জেয়ারত করেন

পঁচাত্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সকল সদস্য এবং নিকট আত্মীয়স্বজনকে পৈশাচিক উপায়ে হত্যা করার পর দেশে চরম ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ

বিস্তারিত »

বঙ্গবন্ধুর কবর প্রথম জেয়ারত করেন মুক্তিযোদ্ধা এজাহার মিয়া

পঁচাত্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সকল সদস্য এবং নিকট আত্মীয়স্বজনকে পৈশাচিক উপায়ে হত্যা করার পর দেশে চরম ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ

বিস্তারিত »

কক্সবাজার রেললাইন হলো, বাদলের স্বপ্নের তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু হল না

সব সাংসদ সংসদ বেত্তা বা পার্লামেন্টারিয়ান হন না, কেউ কেউ হন। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং বর্তমান বাংলাদেশ আমলে যেসব সংসদ গঠিত হয়েছে, তা’ থেকে

বিস্তারিত »

জাতীয় রাজনীতি, সংসদ নির্বাচন ও চট্টগ্রামের ছাত্ররাজনীতির নায়করা

সাতচল্লিশের চৌদ্দই আগস্ট পাকিস্তান ভূমিষ্ঠ হবার পর পূর্ববঙ্গে কোন বিরোধী দলের অস্তিত্ব ছিলো না। কমিউনিস্ট পার্টি বিরোধী দলের ভূমিকা নিতে পারতো, কিন্তু ভ্রান্ত নীতির কারণে

বিস্তারিত »

নোয়াজিশপুরে আবদুল হক চৌধুরী স্মৃতিকেন্দ্র চট্টগ্রামবাসীর তীর্থস্থান

প্রখ্যাত গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর গবেষণা ইতিহাস চর্চায় একটি নতুন ধারা সংযোজন করেছে। কিন্তু তিনি শুধু চট্টগ্রাম নয়, আরাকান এবং সিলেটকেও তাঁর গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করে

বিস্তারিত »

হেলাল উদ্দিন চৌধুরী : একজন সৎ সাহসী ও দক্ষ সাংবাদিকের প্রস্থান

চট্টগ্রামের সাংবাদিক ভুবন থেকে একজন ভালো সাংবাদিক সম্প্রতি হারিয়ে গেলেন। আশির দশকে তিনি কক্সবাজার থেকে এসে দৈনিক আজাদীর রিপোর্টিং বিভাগে যোগদানের মাধ্যমে চট্টগ্রামে তাঁর সাংবাদিক

বিস্তারিত »

ওই মহামানব আসে

আমাদের অপরিমেয় শোক, দুঃখ, রোদনভরা বেদনাঘন একটি দিন পনের আগস্ট। এদিন হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ

বিস্তারিত »

মক্কা বিজয়ের পূর্বাপর মুসলমান ও আওয়ামী লীগের হেমন্ত-বসন্ত আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই লেখা লিখতে লিখতে আমার চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কলামিস্ট, কবি, তার্কিক ইদরিস আলমের কথা

বিস্তারিত »