আজ: বৃহস্পতিবার ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম : প্রকৃতি ও মানুষের সংগ্রাম

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

নদী-সাগর-বন-পাহাড়ের মিত্রতায় প্রকৃতির যে অপরূপ ল্যান্ডস্কেপ তৈরি হয়, তাকে চট্টগ্রাম বা চট্টলা যে নামেই অভিহিত করি না কেন, সে প্রকৃতির এক অপরূপ আশ্চর্য সৃষ্টি। প্রকৃতির এমন আশ্চর্য লীলাভিনয়, রং-রূপ-বেশ বদলের বৈচিত্র্য পৃথিবীর তাবৎ নদী-নির্ভর সভ্যতা খুঁজেও হয়তো পাওয়া যাবে না। প্রকৃতি এখানে ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়-কখনো তার শান্ত, মধুর, মনোহর মুরতি; কখনো রুদ্ধ, ভয়ংকর রূপ। যখন তার শান্তরূপ, তখন লুসাই পাহাড় থেকে ছন্দে ছন্দে নেমে আসা কল্লোলিনী কর্ণফুলীর কলতানে ছোট ছোট ঢেউয়ে নৃত্যের ঝংকার ওঠে।
আর বীচি-বিক্ষুব্ধ বঙ্গোপসাগরের সুনীল জলধির অবিশ্রান্ত গর্জন যখন চট্টল ভূমিপুত্রদের কানে কানে দ্রোহের মন্ত্রণা দেয়, তখন তার ভৈরবী রূপের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তখন কোন্ সুদূর থেকে ছাড়া পাওয়া কোথাকার কোন্ পাগল হাওয়া খোলা সাগর পেরিয়ে বন পাহাড়ের গাছপালা উপড়ে লুটোপুটি খায় খড়ের ছাওয়ায়, টিনের চালে এবং ইট, বালি, সিমেন্ট, লোহা, কংক্রিটের ইমারতে। তরঙ্গ সঙ্কুল সাগরের ফুলে ফেঁপে ওঠা জলরাশি বাঁধ উপচে, ভেঙেÑছিঁড়ে হানা দেয় জনপদে, ভাসিয়ে নিয়ে যায় লোকালয়; প্রকৃতির এই ভয়ংকর রুদ্র রূপের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় বলেই চট্টগ্রামের মানুষ আজন্ম সংগ্রামী। সমতলের চেয়ে রুক্ষ, বন্ধুর উপত্যকায় জীবনের ফুল ফোটানোর সংগ্রাম অনেক কঠিন, কঠোর। পাহাড়ের পটভূমিকায় জীবনের বিস্তার বাংলাদেশে একেবারে দুর্লভ নয়; কিন্তু পাহাড়, নদী আর সাগরের ত্রিবেণী সঙ্গম অবশ্যই দুর্লভ এবং সেটা একমাত্র চট্টগ্রামেই সুলভ। জীবন নির্বাহ ও জীবিকার্জনের জন্য সংগ্রাম করতে করতে সেটি চট্টগ্রামের মানুষের স্বভাব বা অভ্যাসের অন্তর্গত হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বিপ্লবের সূতিকাগার বা বীর প্রসবিনি হওয়ার এটাই বোধ হয় বড়ো কারণ।
চট্টগ্রাম আন্দোলন-সংগ্রাম, বিদ্রোহ-বিপ্লবে অগ্রণী, এটা ইতিহাসের কথা। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে অসহযোগ আন্দোলনে (১৯২০-২১)১ চট্টগ্রামের অগ্রণী ভূমিকায় অভিভূত ও উচ্ছ্বসিত হয়ে মহাত্মা গান্ধী ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় লিখেছিলেনÑ ‘ঈযরঃঃধমড়হম ঃড় ঃযব ভড়ৎব’-‘সবার আগে চট্টগ্রাম’। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা ব্রিটিশ বাহিনীর দুটি অস্ত্রাগার দখল করে চট্টগ্রামের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। এবং ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে সুশিক্ষিত ও অপেক্ষাকৃত ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। ১৯৩২ সালে মাস্টারদার শিষ্যা বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে বিপ্লবী দলের নেতৃত্ব দিয়ে আরেক ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ১৯৩৪ সালে ফাঁসিতে আত্মদানের পূর্ব পর্যন্ত মাস্টারদার সুদক্ষ পরিচালনায় বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, ফেনী, ঢাকা, চন্দননগর, কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ে একের পর এক হামলা চালিয়ে জীবন দেয়া-নেয়ার প্রতিযোগিতায় রক্তের হোলি খেলতে খেলতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে চট্টগ্রাম আর বিপ্লব সমার্থক হয়ে যায় এবং চট্টগ্রাম বিপ্লবতীর্থ হিসেবে নতুন পরিচিতি পায়।
ব্রিটিশরাজ নিখিল ভারতবর্ষকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে সাম্প্রদায়িক ছুরিতে দ্বিখণ্ডিত করে ঊনিশশো সাতচল্লিশের চৌদ্দ ও পনেরই আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি রাষ্ট্রের হাতে ভারতবাসীর ভাগ্য সোপর্দ করে বিদায় নিলেও বাঙালি স্বাধীনতার স্বাদ পায় নি। বরং বিভক্ত বঙ্গের পূর্ব অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে নতুন রাষ্ট্রে নতুন ধাঁচের ঔপনিবেশিক পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়।
বাঙালির ভাষার ওপর দিয়েই শুরু হলো প্রথম আক্রমণ এবং পর্যায়ক্রমে সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিকল্পিত আগ্রাসনের শিকার হলো। তারপর চাকরি, বিনিয়োগ, শিল্প, উন্নয়ন ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হতে হতে এক দেশের মধ্যে দুই দেশ, এক অর্থনীতির মধ্যে দুই অর্থনীতির জন্ম হলো। পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনিতে পরিণত হলো। এই ঔপনিবেশিকিকরণের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাজাত্যবোধ থেকে নতুন করে যে স্বাধীনতা সংগ্রাম সূচিত হলো, সেই সংগ্রামেরও সূচনা চট্টগ্রাম থেকেই হয়েছিলো। ১৯৫১ সালে মোমিন রোডে কদমমোবারক মসজিদ ও এতিমখানার উত্তর পাশে হরিখোলা মাঠে (বর্তমানে সেখানে ‘মৈত্রী ভবন’ নামে একটি ৬তলা ভবন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে) অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সংস্কৃতি সম্মেলনকে যদি বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণের যাত্রাবিন্দু ধরি, তাহলে প্রথমাবধি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রভাগে চট্টগ্রামের সুস্পষ্ট অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। তারপর ৬১ সালে আইয়ুবের সামরিক শাসন ভেঙে ছাত্র আন্দোলনের সূচনা, ৬৬ সালে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা, সত্তরের নির্বাচনের পর চট্টগ্রাম থেকে জননেতা এমএ আজিজের এক দফা তথা স্বাধীনতার বলিষ্ঠ উচ্চারণ, একাত্তরে ২৫ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে হালিশহর হেডকোয়ার্টারে কর্মরত ইপিআর-এর এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামের (মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম) বিদ্রোহ ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা ও তা’ দেশে-বিদেশে প্রচারের জন্য চট্টগ্রামের জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে প্রেরণ, চট্টগ্রাম বেতারের বহদ্দারহাট ট্রান্সমিশন সেন্টারে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, চট্টগ্রামের জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরী, এম আর সিদ্দিকী ও আবদুল্লাহ আল হারুনের প্রথমে ভারতে গিয়ে সেদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ স্থাপন, আগরতলায় জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রথম মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক কাঠামো ও প্রশাসন গড়ে তোলা, জোনাল কাউন্সিল ও যুব শিবির গঠন, স্বাধীন বাংলাদেশে জহুর আহমদ চৌধুরীর প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন ও ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে ভাষণ ইত্যাদি ঘটনা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভূমিকারই প্রমাণ উপস্থাপিত করে।
স্বদেশ চেতনা : সাহিত্যের প্রেরণা
সমগ্র বাংলায় যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঠাঁই ছিল না, তখন চট্টগ্রামের শাহ মোহাম্মদ সগীর ও জৈনুদ্দিন (পঞ্চদশ শতক), শেখ ফয়জুল্লাহ (ষোড়শ শতক) এবং সপ্তদশ শতকে চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে রোসাং রাজদরবারে আলাওল, দৌলত কাজী, মাগন ঠাকুর, আবদুল করিম খোন্দকার প্রমুখের কাব্যচর্চা করে যাচ্ছিলেন। চট্টগ্রামের দুই কবি-প্রতিভা-কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও সৈয়দ সুলতান, বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম ‘পরাগলী মহাভারত’ ও ‘নবী-বংশ’ রচনা করে বাংলা ভাষার মুখে ফুটালেন অফুরন্ত-ভাষা এবং বুকে জাগালেন অনন্ত-আশা। অতঃপর, ধীরে ধীরে বাংলায় রচিত হল মনসা, চণ্ডী ও ধর্ম মঙ্গল, লাইলী মজনু, ইউসুফ-জুলেখা ও মকতুল-হোসেন। বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা হ’ল, বাংলা সাহিত্যের জয় হ’ল।
কবি সৈয়দ সুলতান শুধু বাংলা ভাষার মুখে অফুরন্ত ভাষাই ফোটান নি, তিনি ষোড়শ শতাব্দিতে মাতৃভাষার গৌরব বর্ণনা করে যে পদ রচনা করেছিলেন, চারশো বছর পর বিংশ শতাব্দির মধ্যভাগে নব্যরাষ্ট্র পাকিস্তানে সেই মাতৃভাষার অধিকারের জন্যই রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয় এবং ঢাকার রাজপথে রফিক, জব্বার, বরকত, সালামের রক্তের ধারায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার অঙ্কুরোদগম হয়। সৈয়দ সুলতান (নিবাস বারৈপাড়া, পটিয়া, চট্টগ্রাম) লিখেছিলেন,
বঙ্গদেশী সকলেরে কিরূপ বুঝাইব।
বাকানী আরব ভাষাএ বুঝাইতে নারিব।
যারে সেই ভাবে প্রভু করিছে সৃজন।
সেই ভাষা তায় অমূল্য সেই ধন ॥
(ওফাত-ই-রসুল)
আর ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্র“য়ারি ঢাকায় পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের আরেক করি মাহবুব উল আলম চৌধুরী (জন্ম ৭ নভেম্বর ১৯২৭, গহিরা, রাউজান, চট্টগ্রাম) লিখলেন অমর কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসীর দাবি নিয়ে এসেছি’।
অষ্টাদশ শতাব্দিতে চট্টগ্রামের আর একজন কবি আবদুল হাকিম (নিবাস সন্দ্বীপ) আরো স্পষ্ট ভাষায় বলিষ্ঠ কণ্ঠে এ বঙ্গভূমির জন্য ভালোবাসা এবং বাংলায় জন্মগ্রহণ করে যারা বাংলাভাষা চর্চায় উৎসাহী নয়, তাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে লেখেন
যেসব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সেইসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন যূয়াএ।
নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশে না যাএ।
মাতাপিতামহ ক্রেমে বঙ্গেত বসতি
দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত য়তি।
(নূরনামা)
ঊনবিংশ শতাব্দিতে মহাকবি নবীন চন্দ্র সেনের (জন্ম ১০ ফেব্র“য়ারি ১৮৪৭; নয়াপাড়া, রাউজান, চট্টগ্রাম) ‘পলাশীর যুদ্ধ’ (প্রকাশ ১৮৭৫) গাথাকাব্যে যথারীতি দেশপ্রেম উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে। যদিও মুসলমান প্রসঙ্গের অবতারণায় ও সিরাজদ্দৌলার চরিত্র অঙ্কনে কবি সবসময় (সিরাজের প্রতি দরদও প্রকাশ করেছেন) সাম্প্রদায়িকতামুক্ত মনোভাবের পরিচয় দিতে পারেন নি; তথাপি বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় (যদি উচ্চেস্বরে রোদন, আন্তরিক মর্মভেদী কাতরোক্তি দেশ-বাৎসল্যের লক্ষণ হয়,Ñ তবে সেই দেশবাৎসল্য নবীন বাবুর এবং তাহার অনেক লক্ষণ এই কাব্যমধ্যে বিকীর্ণ হইয়াছে।
কবি লিখেছেন
“পোহাইল বিভাবরী পলাশী প্রাঙ্গণে,
পোহাইল ভারতের সুখের রজনী,
চিত্রিয়া ভারত ভাগ্য আরক্ত বিমানে,
উঠলেন দুঃখভরে ধীরে দিনমণি।”
পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজ বাহিনীর হাতে নিহত নবাব সিরাজদ্দৌলা এক সময় বাঙালির স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে যান এবং তাঁর ইংরেজ-বিরোধী ভূমিকা ও পলাশীর যুদ্ধের মধ্যে বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা প্রকাশিত ও পরিপোষিত হয়। এ প্রসঙ্গে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সিরাজদ্দৌলা’র কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
বস্তুত আধুনিককালে বৃহৎ বঙ্গে স্বাজাত্যবোধ ও স্বাদেশিকতার উদ্বোধনে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ভূমিকার পেছনে সাহিত্যের প্রেরণা কম কাজ করেনি।
এমনি একজন স্বদেশপ্রেমিক কবি হলেন জীবেন্দ্র কুমার দত্ত। তিনি কবি নবীন চন্দ্র সেনের ভাবশিষ্য; স্বদেশকে উপজীব্য করে তিনি অনেক কবিতা রচনা করেন। সেসব কবিতা ‘ভান্ডার’, ‘নব্যভারত’, ‘স্বদেশী’ প্রভৃতি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। তাঁর কাব্য ও কবিতায় বাংলার নিসর্গ ও দেশমাতৃকার বন্দনা অপূর্ব ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে’।১
পটিয়া উপজেলার জঙ্গলখাইন গ্রামের আইনজীবী কবি বিপিন বিহারী নন্দীও ওই সময়ের একজন বিখ্যাত কবি।
‘তাঁর রচিত ‘চন্দ্রধর’ স্বাদেশিকতার ভাবধারায় সমৃদ্ধ একটি উপাখ্যান কাব্য’।২
জীবেন্দ্র কুমারের ভগ্নি কবি হেমন্তবালা দত্তও স্বদেশ বন্দনা ও দেশাত্মবোধক কবিতা রচনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। স্বদেশী আন্দোলনের প্রথম দিকে যখন তিনি কবিতা রচনা শুরু করেন, তখন তিনি নিতান্তই কিশোরী।
মোগলের বিরুদ্ধে সন্দ্বীপের দিলাল রাজার বিদ্রোহ
চট্টগ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সন্দ্বীপের দিলাল রাজার কাহিনীটি স্থান পেতে পারে। প্রবল পরাক্রান্ত বিদেশী শক্তি মোগলের আগ্রাসনের মুখে বশ্যতা স্বীকার না করে আপন রাজ্যের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তিনি বীরের মত লড়াই করে দেশপ্রেমের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
দিলাল রাজার প্রকৃত নাম দেলোয়ার খাঁ; কিন্তু সন্দ্বীপের ঘরে ঘরে তিনি দিলাল রাজা নামেই পরিচিত ও পূজিত হয়ে থাকেন।
ছোটবেলায় পিতার মৃত্যুর পর তিনি রাখালের কাজ করতে বাধ্য হন। রাখালদের সঙ্গে গরু চরানোর ফাঁকে ফাঁকে তাদের রাজা সাজতেন তিনি। ধীরে ধীরে রাখাল রাজ দিলাল সন্দ্বীপ হতে মগ পর্তুগিজদের বিতাড়নের স্বপ্ন দেখতে থাকেন এবং অবশেষে রাখালদের নিয়ে একটি শক্তিশালী দল গঠন করতে সক্ষম হন। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে সন্দ্বীপ থেকে পর্তুগিজ বিতাড়নের পরপরই তিনি রাখাল সঙ্গীদের নিয়ে সন্দ্বীপের শাসন ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন; তার আগে আরাকানিদের সঙ্গে মৌখিক আপস রফা করে নেন।
১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে মোগল অধিকারের অর্ধশত বৎসরাধিককাল পূর্ব পর্যন্ত প্রায় স্বাধীন রাজার মতো তিনি সন্দ্বীপ শাসন করেন। তিনি মগ-পর্তুগিজদের সম্পূর্ণভাবে দমন করে সন্দ্বীপবাসীদের জীবনে শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আনুমানিক ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দে সন্দ্বীপে আরাকানিদের আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন।
তবে দিলাল রাজার প্রকৃত মহত্ত বা বীরত্বের প্রমাণ মোগলদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাওয়া যায়। সেই যুদ্ধে তিনি শক্তিশালী মোগল বাহিনীর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেন নি সত্য, কিন্তু দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ৮৫ বছর বয়সে বীরের মত লড়াই করে পরাজয়বরণ করেও গৌরবের যে ইতিহাস রচনা করেন, তা তাঁকে সন্দ্বীপের ইতিহাসে অমরত্বের চিরস্থায়ী পাকা আসনে বসিয়ে দিয়েছে।
১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ নভেম্বর মোগল বাহিনী দ্বিতীয়বার (প্রথম আক্রমণের তারিখ ৬ নভেম্বর ১৬৬৫) সন্দ্বীপ আক্রমণ করলে দিলাল রাজা সিংহ বিক্রমে যুদ্ধ করেও হার মানতে বাধ্য হন এবং তাঁকে বন্দী করে ১২ জন আত্মীয়-স্বজনসহ ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এক বছর পর মোগল বন্দীশালায় সন্দ্বীপ কেশরীর জীবনান্ত হয়।
আবু তোরাবের ব্রিটিশÑবিরোধী সংগ্রাম
দিলাল রাজা মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, একশো বছর পর তাঁর জামাতা চাঁদ খাঁর বংশের চতুর্থ প্রজন্মে ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নতুন দামামা বেজে ওঠে। চাঁদ খাঁর এই চতুর্থ অধস্তন পুরুষের নাম আবু তোরাব চৌধুরী। তিনি চাঁদ খাঁর জমিদারির এক অংশ লাভ করেন। সন্দ্বীপের সমসাময়িক জমিদারদের মধ্যে তিনি সবচে’ বেশি ক্ষমতাশালী ও দুর্ধর্ষ জমিদার ছিলেন। ১৭৫০ সাল থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি সন্দ্বীপের ওপর পূর্ণ শাসন কর্তৃত্ব লাভ করেছিলেন।
১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসন ক্ষমতা লাভের পর হ্যারি ভেরেলস্ট চট্টগ্রামের চিফ নিযুক্ত হন। তার সদর দপ্তরের কেরানী ও বেনিয়ান ছিলেন খিদিপুরের ভূকৈলাসের ঘোষাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোকুল ঘোষাল। মোগল আমলের শেষ ওয়াদ্দাদার ওজাকুর মলের স্থলে ভেরেলস্ট ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে গোকুল ঘোষালকে বেনামীতে সন্দ্বীপের ওয়াদ্দাদার নিযুক্ত করেন। গোকুল ঘোষাল তার একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী বিষ্ণুচরণ বসুর নামে ওয়াদ্দাদারি নিয়েছিলেন। নায়েব ওয়াদ্দাদার নিযুক্ত হয়েছিলেন রাম কিশোর বাড়–জ্জে। তিনি রাজস্ব সংগ্রহের জন্য ১৭৬৩/৬৪ খ্রিস্টাব্দে সন্দ্বীপে যান। তখনই সন্দ্বীপে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা।
রামকিশোর মূর্তিমান উপদ্রব হয়ে সন্দ্বীপে উদয় হন; তার একের পর এক স্বৈরাচারী কার্যকলাপ সন্দ্বীপে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দেয়। প্রথমে তিনি করের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন; তারপর ছলচাতুরি, জালিয়াতি ও জবরদস্তির মাধ্যমে স্থানীয় জমিদারদের জমি কেড়ে নিতে থাকলে আবু তোরাব চৌধুরীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। গোকুল ঘোষাল যেদিন বেনামীতে সন্দ্বীপের ওয়াদ্দাদার নিযুক্ত হন, সেদিন থেকেই আবু তোরার চৌধুরী ক্রোধে, ক্ষোভে ফুঁসছিলেন। এখন তার (গোকুল ঘোষাল) প্রতিনিধিদের সন্দ্বীপ গ্রাসের প্রবণতা দেখে আবু তোরাব চৌধুরী আত্মরক্ষার সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হন। তিনি ওয়াদ্দাদারের কাছে রাজস্ব জমা দেয়া বন্ধ করে দেন এবং সন্দ্বীপ থেকে গোকুল ঘোষালের প্রতিনিধিদের বিতাড়িত করার জন্য তার সেনাপতি মালকান সিংকে নির্দেশে দেন। মালকানের প্রস্তুতির খবর পেয়ে ওয়াদ্দাদার সম্ভাব্য বিদ্রোহ দমনের জন্য নবাবের কাছে চিঠি লেখেন। তোরাব ও মালকানের বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য নবাবের নির্দেশে চট্টগ্রাম এবং লক্ষ্মীপুর থেকে একদল সিপাহী সন্দ্বীপে প্রেরিত হয়। তা’ সত্ত্বেও কিছুদিনের মধ্যে ওয়াদ্দাদারের লোকজন সন্দ্বীপ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। ওয়াদ্দাদার আবার নবাবের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠান। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে মেজর গ্রান্টের নেতৃত্বে দুই কোম্পানি সৈন্য ও কয়েকটি বড় বন্দুক পাঠানো হয়। আবু তোরার পুরো কোম্পানিকে ধ্বংস করে সব বন্দুক কব্জা করেন। এরপর ক্যাপ্টেন নলিকিন্সের নেতৃত্বে দু’কোম্পানি সৈন্য পাঠানো হয়। তার সাহায্যের জন্য পাঠানো হয় ক্যাপ্টেন এলারকারকে, সঙ্গে আরো দু’ কোম্পানি সৈন্য। নবাবের নির্দেশে বামনিতে আগে থেকেই দু’ কোম্পানি সৈন্য অবস্থান করছিলো। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে সন্দ্বীপ শহরের সামান্য উত্তরে চারি আনি হাট’ সংলগ্ন ‘কিল্লাবাড়ি’তে আবু তোরাব চৌধুরীর বাহিনীর সাথে ক্যাপ্টেন নলিকিন্সের যুদ্ধ হয়। আবু তোরাব অসীম সাহসে ইংরেজ বাহিনীর মোকাবেলা করেন। এবং চরম শৌর্যবীর্য প্রদর্শন করে অমিত বিক্রমে লড়ে যান। অবশেষে যুদ্ধ করতে করতে যুদ্ধক্ষেত্রেই বীরের মৃত্যুবরণ করেন।
তবে শত্র“পক্ষের হাতে তাঁর মৃত্যু নাও হয়ে থাকতে পারে। কারণ কারো কারো মতে নিজ দলের এক জমাদার গুপ্তঘাতকের শস্ত্রাঘাতেই তাঁর প্রাণবিয়োগ হয়। আবু তোরাবের পরাজয়ের জন্যও তাঁর এক আত্মীয়ের বিশ্বাসঘাতকতাকে দায়ী করা হয়। ঐ আত্মীয় নাকি তাঁর গোপন সমর-কৌশল ইংরেজদের নিকট আগেভাগে জানিয়ে দিয়েছিলো। আবু তোরাবের সেনাপতি মালকান সিং পলাতক অবস্থায় ধরা পড়েন; তাঁকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয় সন্দ্বীপ টাউনে।
চাকমা বিদ্রোহ
ইংরেজদের দেওয়ানি রাজস্ব দিতে যারা অস্বীকৃতি জানায় তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠী। এর ফলে ইংরেজদের সাথে চাকমা শাসকগোষ্ঠীর প্রথমে বিরোধ এবং পরে সংঘর্ষ আরম্ভ হয়। ১৭৭২ থেকে ১৭৯৮ সাল পর্যন্ত এই সংঘর্ষ চলেছিল। সেনাবাহিনী নিয়োগ করে অত্যন্ত কঠোরতার সাথে চাকমাদের প্রতিরোধ নির্মূল করা হয়।
সন্দ্বীপে জমিদার ও কৃষক বিদ্রোহ
আবু তোরাবের পথ ধরে সন্দ্বীপে পরবর্তীকালে আরো বহু বিদ্রোহ সংঘটিত হয়; তিনি যে বিদ্রোহের ধ্বজা উড়িয়ে দেন, তাকে উড্ডীন রাখতে এগিয়ে আসেন জমিদার ও কৃষকরা। গোকুল ঘোষাল আবু তোরাবের জমিদারি ভবানীচরণ দাসের নামে বন্দোবস্ত করে নেন। লেনদেনের গোলমাল দেখিয়ে এবং অন্যান্য কৌশলে অন্য জমিদারের জমিসমূহ তিনি কেড়ে নেন। হৃতসর্বস্ব জমিদারগণ দলবদ্ধ হয়ে বাংলার তৎকালীন গভর্নর কার্টিয়ারের সুপারিশসহ মুর্শিদাবাদের নায়েব দেওয়ান সৈয়দ রেজা খাঁর দরবারে নালিশ করেন। রেজা খাঁ পূর্বের শর্ত অনুসারে জমিদারের নিকট তাদের জমিদারি ফিরিয়ে দেয়ার আদেশ দেন। গোকুল ঘোষাল এ আদেশ না মেনে ধীরে ধীরে সন্দ্বীপের তিন চতুর্থাংশ জমিদারির মালিক হয়ে বসেন। ইংরেজ শক্তির সমর্থনপুষ্ট গোকুলের অবাধ লুণ্ঠন ও উৎপীড়নে সোনার দ্বীপ সন্দ্বীপ শ্মশান হয়ে যায়।
বহু কৃষক পরিবার সন্দ্বীপ থেকে নোয়াখালী পালিয়ে যায়। কৃষকদের আবেদন-নিবেদন ব্যর্থ হলে, তারা গোকুল ঘোষাল ও ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হন। প্রথমে তারা খাজনা প্রদান বন্ধ করে দেন। গোকুলের পেয়াদা ও পুলিশ খাজনার জন্য কৃষকদের ঘরে ঘরে হানা দিয়ে তাদের যথাসর্বস্ব কেড়ে নিতে থাকে।
কৃষকগণ দলবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ালে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, এমনকি যুদ্ধবিগ্রহ সংগঠিত হতে থাকে। এই বিদ্রোহ দ্রুত সমগ্র সন্দ্বীপে বিস্তার লাভ করে গোকুল ঘোষালের ওয়াদ্দাদার ও জমিদারি ধ্বংস করতে উদ্যত হয়। হৃতসর্বস্ব জমিদারগণও কৃষকদের সঙ্গে এই বিদ্রোহে যোগ দেন। একটি খণ্ডযুদ্ধে মোহাম্মদ কাইম চৌধুরী নামে একজন বিদ্রোহী নেতা শহীদ হন ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে।
গোবিন্দচরণ চৌধুরী নামক একজন বর্ধিষ্ণু কৃষকের নেতৃত্বে আরেকটি কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। তাঁর নেতৃত্বে কৃষকগণ সর্বত্র সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে। ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে জমিদারের পাইক-বরকন্দাজদের সঙ্গে গোবিন্দচরণের নেতৃত্বে বিদ্রোহী কৃষকগণের ঘোরতর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে জমিদার প্রাণকৃষ্ণের বাহিনী শোচনীয়রূপে পরাজিত হয়। গোবিন্দচরণ সকল সন্দ্বীপবাসীর নিকট হতে ‘বীর’ আখ্যা লাভ করেন। মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহেও চট্টগ্রামে সিপাহীরা বিদ্রোহ করে ট্রেজারি লুট ও পুড়িয়ে দিয়েছিলো এবং কারাগার ভেঙে বন্দীদের ছেড়ে দিয়েছিলোÑএ ঘটনাও চট্টগ্রামের বিদ্রোহের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
মুন্সি চাঁদ মিয়ার বিদ্রোহ
১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ন্যামস্তি নিবাসী মুন্সি চাঁদ মিয়ার নেতৃত্বে সন্দ্বীপে সংগঠিত বিদ্রোহ পূর্ববর্তী সকল বিদ্রোহ থেকে চরিত্রগতভাবে পৃথক। প্রথমত এটি ছিলো কৃষকদের দ্বারা সংগঠিত, কৃষক নেতৃত্বে পরিচালিত সম্পূর্ণ একটি কৃষক বিদ্রোহ। দ্বিতীয়ত এটি ছিলো একটি অহিংস আন্দোলন। পূর্ববর্তী বিদ্রোহগুলোর চরিত্র ছিলো সামরিক, সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে সমরাস্ত্র নয়, জনগণের ঐক্যবদ্ধতাই ছিলো প্রকৃত শক্তি। মুন্সি চাঁদ মিয়ার নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সন্দ্বীপের সকল কৃষক সেদিন একতাবদ্ধ হয়েছিলেন।
তিনি প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে না জড়িয়ে অসহযোগের পন্থা অবলম্বন করেন। সংগ্রামের পদ্ধতি হিসেবে অসহযোগ তখনো পর্যন্ত প্রচলিত হয় নি; অনেক পরে ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের এক পর্যায়ে (১৯২১) মহাত্মা গান্ধী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নিরস্ত্র অধ্যায়ের শেষ পর্যায়ে (মার্চ ১৯৭১) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ নীতি ও কৌশল প্রয়োগ করে চরম সাফল্য অর্জন করেছিলেন।
এদিক থেকে বিচার করলে মুন্সি চাঁদ মিয়া তাঁর সময়ের তুলনায় অভিনব কৌশল প্রয়োগ করে বেশ দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন এবং সেজন্যে তাঁকে অসহযোগ আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
চাঁদ মিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত কৃষক বিদ্রোহের কারণ সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো। ইজারা ব্যবসা ব্যর্থ হওয়ার পর সরকার ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে প্রায় তিন চতুর্থাংশ জমিদারি নিলামে বিক্রি করে দিলে এছিলা কোর্জন একাই অর্ধেক এবং পি. জে. ডেলানী ও শিবদুলাল তেওয়ারী বাকি জামিদারি কিনে নেন।
১৮৭১ সালে ভবানীচরণের জমিদারি চূড়ান্তভাবে নিলামে উঠলে মোহাম্মদ গাজি চৌধুরী ও মিসেস এলেনা জে ডেলানী সন্দ্বীপের অবিশষ্ট এক চতুর্থাংশ জমিদারি ক্রয় করেন।
অসহযোগ আন্দোলন
১৮৭০ সালের মার্চ মাসে এ্যাচিলা কোর্জন সন্দ্বীপে জমিদারি ক্রয় করে প্রবল প্রতাপে খাজনা আদায় ও প্রজাশাসন করতে আরম্ভ করেন। কোর্জন স্থির করেন যে, তিনি প্রজাদের অমতেই তাদের তালুক প্রভৃতি পরিমাপ করবেন, জোরপূর্বক তাদের নিকট হতে কবুলিয়ত সম্পাদন করে নেবেন। রাজবিধি লঙ্ঘন করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভূমির জমা বৃদ্ধি করবেন। এসব কল্পনা করে তিনি সদলবলে বহুশত আমীন ও আমলা নিয়ে সন্দ্বীপে উপস্থিত হয়েছিলেন। প্রয়োজনে অবাধ্য প্রজাদের বাড়িঘর ধূলায় মিশিয়ে দেবার জন্য এই আমীন-আমলা-বাহিনীর সাথে হাতী-ঘোড়া, গুলিগোলাও তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন সন্দ্বীপবাসীগণ একতার যে পরিচয় দিয়েছিল, তার ফলে কোর্জন সাহেবের এত উদ্যোগ ও যতœ বিফল হয়েছিল। আগেই বলা হয়েছে, চাঁদ মিয়া প্রথমেই প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের পথ এড়িয়ে অসহযোগের পথ গ্রহণ করেন। তাঁর নির্দেশে কোর্জনের জমিদারির সর্বত্র সকল প্রজা সভা-সমিতি করে নিম্নোক্তরূপ প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন :
১) কোন প্রজা জমিদারের আমলা বা আমীনের প্রতি অত্যাচার করতে বা তাদেরকে বাড়িতে স্থান দিতে পারবে না; ২) কোন প্রজা তাদের নিকট খাদ্যদ্রব্য বিক্রয় করতে বা দান করতে পারবে না; ৩) আমীনগণ জমি জরিপ করতে ইচ্ছা করলে তাদেরকে কেউ জমির পরিচয় দিয়ে জরিপে সাহায্য করবে না; ৪) যে প্রজা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে কোন প্রকারে জমিদারের কর্মচারীগণকে সাহায্য করবে, আমলাদের উপর অত্যাচার না করে যে প্রজা আমলাদের সাহায্য করবে তার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হবে।
এরূপ সংঘবদ্ধতার ফলে জমিদারের কর্মচারীগণ প্রজাদের নিকট হতে কোন সাহায্য পায় নি এবং প্রজাদের সংঘবদ্ধতা ও দৃঢ়তা দেখে জমিদারও কোন প্রজার উপর কোনরূপ অত্যাচার করতে সাহসী হয় নি। জমিদার শেষ পর্যন্ত এক কপর্দকও খাজনা আদায় অথবা অন্য কোন উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে না পারায় সদলবলে সন্দ্বীপ ত্যাগ করে চলে যান। কেবলমাত্র সংঘবদ্ধতা ও দৃঢ়তার বলে বিনা রক্তপাতেই সন্দ্বীপের প্রজাগণের এই বিদ্রোহ সম্পূর্ণ সাফল্যমণ্ডিত হয়।
এই বিদ্রোহের সময় প্রজাদের কর্তব্য ও সংগ্রাম-কৌশল নির্দেশ করে স্থানীয় ভাষায় একটি ‘ছড়া’ (গ্রাম্য কবিতা) রচিত হয়েছিল। এই ‘ছড়া’টি কৃষকগণের মুখে মুখে সুর সহকারে গীত হত। ছড়াটি নিম্নরূপ:
(প্রত্যেক পঙক্তির নীচে বঙ্গানুবাদ দেওয়া হল)
কিগো হাসুনির বাপ্ আইলানা ক্যা কাইল বৈডকে
(হাসিনার বাবা কাল বৈঠকে এলে না কেন?)
আমিন ক’দিন ফিরব চকে চকে
(আমিন কত দিন মাঠে মাঠে ঘুরবে)
গোলা গোলা মাপুক্ গই যাই চিন্ দিতাম্ ন জমিনে
(মাঠে মাঠে মাপুক গিয়ে-জমিনে চিহ্ন দেবনা)
বেল্লিশ সনের চিডা দি আর কিত্ত হারে আমিনে
(’৪২ সনের (বাংলা ১২৪২, ইংরেজি ১৮৩৫) জরিপের কাগজপত্র দিয়ে আমিন কি করতে পারবে?)
মাইরত গেলে বাড়িত ধাই যাম থাবাতে।
(মারতে গেলে দৌড়ে বাড়ি গিয়ে তফাতে চয়ে যাব)
আরতে কই দিব হেইতে বাড়ীত নাইÑকইলকাতা থাকে
(স্ত্রী বলে দেবে, তিনি বাড়িতে নাই- কলকাতা থাকে।)
হুইনছনি ভাইছাবেরা চান মিয়া যে কই হাডাইছে।
(ভাই সাবেরা শুনেছ? চান মিয়া যে বলে পাঠিয়েছেন)
লাল্ বলদ লাগাই দুমু যেইতের বাড়ীত আমিন আছে।
(লাল বলদ (আগুন) লাগিয়ে দেব-যাদের বাড়িতে আমিন আছে)
জুম্মার নঅজ হইত্তে, হুইনলাম মজিদে ছল্লা
(জুম্মার নামায পড়তে শুনলাম মসজিদে শলা-পরামর্শ)
জরিপ কইত্তাম দিতামন ভাই যাউক কল্লা
(মাথা গেলেও জরিপ করতে দেবে না)
জমার র্প চান্দা দর আষ্টেআনা তোলার হর
(জমার পর চাঁদা দর আট আনা টাকার পর)
চাইডগাঁর হুইলাম খবর গোলজানের বাপ বোওডে গেছে
(চট্টগ্রামের সংবাদ শুনলাম যে গোলজানের বাবা বোর্ডে অর্থাৎ ‘রেভেনিউ বোর্ডে’ গিয়াছেন।)৩
টীকা
১. সুনীতি ভূষণ কানুনগো : ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম (চট্টগ্রাম : ২০০৫) পৃ. ১৩-১৪।২. সুনীতি ভূষণ কানুনগো : প্রাগুক্ত। পৃ. ১৪। ৩. রাজীব হুমায়ুন : সন্দ্বীপের ইতিহাস-সমাজ ও সংস্কৃতি : (সন্দ্বীপ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ, ঢাকা, ১৯৮৭) পৃ.১১০-১১১।
নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

বঙ্গবন্ধু টানেল ও একজন স্বপ্নবাজ প্রধানমন্ত্রীর গল্প

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নয়নের এমন উচ্চতায় উপনীত করে এক একটি রেকর্ড সৃষ্টি করে যাচ্ছেন যে, যাঁরা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসবেন তাদের জন্য এই রেকর্ড

বিস্তারিত »

মুক্তিযুদ্ধে পটিয়া : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

এক সময় সমগ্র চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে পটিয়া থানা ছিলো সর্বদিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা অগ্রগণ্য স্থান। ঢাকা জেলার মধ্যে বিক্রমপুর যেমন সর্বদিক দিয়ে একদা সর্বাধিক অগ্রগণ্য ছিল,

বিস্তারিত »

নির্বাচন ১৯৭০ স্বাধীনতার রায়

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ নির্বাচনে বাঙালি জাতি ৫৪ সালের পর দ্বিতীয় বার ঐক্যবদ্ধ হতে স্ব-শাসনের পক্ষে রায় প্রদান

বিস্তারিত »

জাফর আহমদ সংগ্রাম ও সাহসের মহিমায় প্রদীপ্ত জীবন : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

১৯৬৬ সাল জাফর আহমদের জীবনে একটি টার্নিং পয়েন্ট। সেবছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে প্রথম ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি

বিস্তারিত »

এম এ ওহাব : রাজনীতিতে সততা ও আদর্শনিষ্ঠার উজ্জ্বল উদাহরণ : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

  প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ, স্বাধীনতা সংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবী এম.এ. ওহাব ১৯২৪ সালে ১ মার্চ হাটহাজারি থানার ফতেপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খলিলুর রহমান ১৯২০-৪৮ খ্রিস্টাব্দ

বিস্তারিত »

পটিয়ায় শিক্ষা বিস্তার ও আহমদ হোসেন খানের সাধনা : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী |

মুসলমানরা যখন ইংরেজি শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছিলো, তখন তাদেরকে এই আত্মঘাতী পথ থেকে সরে এসে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন

বিস্তারিত »

ডা. শামশুল আলম এবং চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার গোড়ার কথা : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

যাঁদের সমর্থন ও সহযোগিতায় চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিলো, ডা. শামশুল আলম চৌধুরী তাঁদের একজন। তিনি ঢাকায় রোজ গার্ডেন সম্মেলনে গিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে তাঁরা

বিস্তারিত »

পুথি সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ ইসহাক চৌধুরীর প্রস্থান : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

ইসহাক চৌধুরী বহুতর পরিচয়ে একজন বিশিষ্ট বৌদ্ধিক পুরুষ ছিলেন। তাঁকে বলা যায় লেখক, গবেষক, পুঁথি সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ এবং বিবলিওগ্রাফার। কিন্তু আমার বিবেচনায় তাঁর শ্রেয়তর পরিচয়

বিস্তারিত »

বিপ্রতীপ সময়ে একজন শুদ্ধ রাজনীতিকের নীরব প্রস্থান মৃণাল কুসুম বড়–য়ার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি : নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা ও চাকসুর সাহিত্য সম্পাদক মৃণাল কুসুম বড়–য়া অনেক দিন ধরেই আমার বাসায় আসতে চাচ্ছিলেন। বারবার আমাকে ফোন করে বলতেন আজকালের মধ্যে

বিস্তারিত »